ধাকার পুরনো মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা ১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে প্রথম শহীদ মিনার গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়। দুই দিন আগে, ২১ ফেব্রুয়ারি পুলিশ গুলিতে বহু ভাষা কর্মী নিহত হয়, ফলে শহরের বিভিন্ন স্থানে শোকের পরিবেশ ছড়িয়ে পড়ে।
শহরে কঠোর কারারোধ আর সামরিক টহল চালু থাকায় ছাত্রদের জন্য নির্মাণ সামগ্রী সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। মেডিকেল কলেজের ক্যাম্পাসে সম্প্রসারণ কাজ চলছিল, ফলে হোস্টেলের সামনে ইট ও বালি জমা ছিল, তবে সিমেন্টের অভাব ছিল বড় বাধা।
একই সময়ে, হোস্টেলের পাশে একটি গুদামে স্থানীয় ঠিকাদার একটি পর্যাপ্ত সিমেন্টের মজুদ রাখে থাকায় ছাত্রদের কাছে এটি একটি সম্ভাব্য সমাধান হয়ে ওঠে। গুদামটি কারারোধের সময়ে সরাসরি প্রবেশযোগ্য না হওয়ায়, তারা ঠিকাদারের পরিচয় জানার চেষ্টা করে।
অনুসন্ধানের পর জানা যায়, গুদামের দায়িত্বে ছিলেন পুরনো ঢাকার প্রখ্যাত সমাজসেবী ও নেতা পিয়ারু সরদার। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন ছাত্র অন্ধকারে তার বাড়িতে গিয়ে সাহায্য চায়।
সেই সময়ের শহীদ মিনার ডিজাইনার সাঈদ হায়দারও এই ঘটনার বর্ণনা দেন। পিয়ারু সরদার ছাত্রদেরকে চাবি তুলে নিয়ে যত সিমেন্ট দরকার তত নেয়ার অনুমতি দেন, তবে সকালে চাবি ফেরত দিতে হবে বলে শর্ত রাখেন। এই সহজ অনুমোদনই ছাত্রদেরকে দ্রুত সিমেন্ট সংগ্রহ করে শহীদ মিনার নির্মাণে এগিয়ে নিতে সহায়তা করে।
ছাত্ররা ইট, বালি ও সরবরাহকৃত সিমেন্ট ব্যবহার করে হোস্টেলের সামনের খালি জায়গায় একটি ক্ষুদ্র কাঠামো গড়ে তোলেন, যা পরে দেশের প্রথম শহীদ মিনার হিসেবে স্বীকৃত হয়। এই স্মারকটি ভাষা আন্দোলনের শহীদদের প্রতি সম্মানসূচক হিসেবে কাজ করে এবং পরবর্তী বছরগুলোতে জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তি স্থাপন করে।
পিয়ারু সরদারের এই সহায়তা সময়ের কঠিন পরিস্থিতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ মানবিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়। তার এই কাজের প্রশংসা করে সাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হক পরে একটি কবিতায় পিয়ারু সরদারকে স্মরণীয় করে তোলেন, যেখানে তিনি শহীদ মিনারের প্রথম নির্মাতা হিসেবে তার অবদানকে তুলে ধরেছেন।
শহীদ মিনারের প্রথম নকশা ও নির্মাণের পেছনে সাঈদ হায়দারের ভূমিকা ও পিয়ারু সরদারের সহযোগিতা ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য। এই ঘটনা ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষণে সমাজের বিভিন্ন স্তরের সমন্বিত প্রচেষ্টার উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
আজকের শহীদ মিনার, যদিও মূল কাঠামো থেকে বহু পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গিয়েছে, তবু পিয়ারু সরদার ও মেডিকেল কলেজের ছাত্রদের সেই প্রাথমিক প্রচেষ্টার স্মৃতি বহন করে। ভবিষ্যতে ভাষা আন্দোলনের শিক্ষা ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে এই স্মারকটি নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করতে থাকবে।



