বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকিং খাতে ঋণের গঠন ও ডিফল্টের প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে। সেপ্টেম্বর শেষের হিসাব দেখায় মোট ঋণের পরিমাণ ১৭ লাখ ৪১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা, যার মধ্যে মোট ডিফল্ট হার ৩৬.৩ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, ঋণের আকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিফল্টের হারও বৃদ্ধি পায়।
ছোট ও মাঝারি গ্রাহকদের ক্ষেত্রে, ১ কোটি টাকার নিচে ঋণ গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিরা মোট ৪ লাখ ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকার ঋণ গ্রহণ করেছে। এ গোষ্ঠীর ডিফল্ট হার ১৫.২ শতাংশ, যা মোট গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ছোট ঋণের ডিফল্ট হার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল, যা এই গোষ্ঠীর ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা নির্দেশ করে।
১ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকার ঋণ গ্রহণকারী গোষ্ঠীর মোট ঋণ পরিমাণ ৩ লাখ ৭০ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এই সেগমেন্টে ডিফল্ট হার ২৭.৯ শতাংশ, যা ছোট ঋণের তুলনায় বেশি। তবে পুরো ১-১০ কোটি টাকার পরিসরে গড় ডিফল্ট হার ২১.৫৫ শতাংশ, যা মাঝারি ঋণের ঝুঁকি স্তরকে প্রকাশ করে।
বড় ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে ডিফল্টের হার আরও উঁচুতে পৌঁছেছে। যদিও বৃহৎ ঋণের মোট পরিমাণের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশিত হয়নি, তবে ডিফল্টের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হওয়ায় ব্যাংকিং সুশাসনের জন্য তা বড় হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে কিছু বড় গ্রাহকের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগও উঠে এসেছে, যা আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের বিষয়।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাধারণ সম্পাদক ও ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহসান জামান চৌধুরী উল্লেখ করেন, বড় গ্রাহকদের মধ্যে ঋণ নেওয়ার পর ফেরত না দেওয়ার ধারণা ব্যাপক। তিনি এটিকে দেশের জাতীয় সমস্যারূপে চিহ্নিত করে সমাধানের জরুরি প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
আহসান জামান চৌধুরীর মতে, ছোট ও মাঝারি গ্রাহকরা মূলত ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল এবং ঋণকে টেকসই ব্যবসা চালানোর উপায় হিসেবে ব্যবহার করে। তাদের সক্রিয়তা ও ঋণ পরিশোধের ইচ্ছা দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খানও একই দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার জন্য ঋণকে অপরিহার্য উপকরণ হিসেবে গ্রহণ করে এবং ব্যাংক তাদের জন্য বিভিন্ন সুবিধা প্রদান করে। ফলে ব্র্যাক ব্যাংকের ডিফল্ট হার পুরো ব্যাংকিং সেক্টরের তুলনায় কম রয়ে গেছে।
ডেটা বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট হয়, ঋণের আকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিফল্টের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। ছোট ঋণগ্রহীতারা ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল পায় এবং সময়মতো পরিশোধ করে, ফলে ডিফল্টের হার কম থাকে। অন্যদিকে বড় ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে ঋণ পরিশোধে অনিচ্ছা ও অবৈধ আর্থিক কার্যকলাপের সম্ভাবনা বেশি, যা ব্যাংকিং খাতের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি স্বরূপ।
এই প্রবণতা ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্য সতর্ক সংকেত। ঋণ প্রদান নীতি ও তদারকি শক্তিশালী করা, বড় ঋণগ্রহীতাদের জন্য কঠোর শর্ত আরোপ করা এবং ডিফল্টের ঝুঁকি কমাতে প্রো-অ্যাকটিভ ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর জন্য আর্থিক সহায়তা বজায় রাখা উচিত, যাতে তারা অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।
ভবিষ্যতে, যদি বড় ঋণের ডিফল্ট হার নিয়ন্ত্রণে না আনা যায়, তবে ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অন্যদিকে, ছোট ও মাঝারি ঋণের স্বল্প ডিফল্ট হার বজায় রাখলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ইতিবাচক প্রভাব থাকবে। তাই নীতিনির্ধারকদের জন্য জরুরি হল, ঋণ গঠনকে সুষম করে বড় ঋণের ঝুঁকি কমানো এবং ছোট ঋণের প্রবেশযোগ্যতা বাড়ানো।
সংক্ষেপে, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য দেখায় যে ছোট ঋণগ্রহীতারা দেশের অর্থনৈতিক গতিশীলতার মূল চালিকাশক্তি, আর বড় ঋণগ্রহীতাদের ডিফল্ট ও অবৈধ আর্থিক কার্যকলাপের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ না করলে ব্যাংকিং খাতের সুশাসন ও স্থায়িত্বে বড় বাধা সৃষ্টি হতে পারে।



