গতকাল, ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে চলমান ‘আলো’ শিরোনামের শিল্পপ্রদর্শনীতে প্রথম আলো ভবনের ধ্বংসাবশেষের সামনে বিশাল সংখ্যক দর্শক একত্রিত হন। উগ্রবাদী গোষ্ঠীর আক্রমণ ও অগ্নিকাণ্ডের পর দগ্ধ ভবনের ভেতরে পুড়ে যাওয়া কম্পিউটার, যন্ত্রাংশ, টেবিল, চেয়ার, বই ও নথিপত্রকে শিল্পকর্মের রূপে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই প্রদর্শনীটি প্রথম আলো ভবনে ঘটিত হিংসাত্মক ঘটনার স্মৃতি সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সতর্ক করার উদ্দেশ্যে আয়োজন করা হয়েছে।
প্রদর্শনীতে ভিজিটররা পুড়ে যাওয়া সামগ্রীর মধ্যে থেকে উদ্ভূত ধ্বংসের ভয়াবহতা ও পুনর্জন্মের প্রতীক দেখেন। পুড়ে যাওয়া যন্ত্রপাতি ও নথিপত্রের পাশে জ্বলন্ত শিখা থেকে উঠে আসা আলোকে তারা জীবনের পুনরুত্থানের রূপে ব্যাখ্যা করেন। দর্শকরা একসঙ্গে বিস্ময় ও দুঃখ প্রকাশ করে, একই সঙ্গে এমন আক্রমণ আর না ঘটার জন্য দায়িত্বশীলদের ন্যায়বিচার ও স্বাধীন সাংবাদিকতার সুরক্ষার আহ্বান জানান।
বিকেলে প্রদর্শনীতে উপস্থিত ছিলেন হোসেন জিল্লুর রহমান, যিনি পূর্বে তত্ত্বাবধায়ক ও সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি প্রথম আলো ভবনে ঘটিত হামলাকে “অত্যন্ত দুঃখজনক” এবং “গহীন ক্ষত” হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই ধ্বংসাবশেষকে শিল্পের মাধ্যমে উপস্থাপন করা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হিসেবে কাজ করবে।
হোসেন জিল্লুর আরও জানান, প্রথম আলো ভবনে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। প্রথমটি হল, প্রতিষ্ঠানটি মব সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে; দ্বিতীয়টি হল, পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ঘটিত এই ঘটনার প্রতি রাষ্ট্রের নিস্পৃহতা দেখা গেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই দুই ঘটনার ভিত্তিতে এখন স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও সমাধান দরকার, যাতে একই রকম নির্মমতা আর না ঘটে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বর্তমান অগ্রযাত্রা যদি সত্যিকারের হয়, তবে প্রথম আলো ভবনে ঘটিত নির্মমতার কারণ অনুসন্ধানই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। এ ধরনের অনুসন্ধান না হলে পুনরাবৃত্তি রোধ করা কঠিন হবে।
গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে, উগ্রবাদী গোষ্ঠী প্রথম আলো কার্যালয়ে আক্রমণ চালায়। তারা ভবনের ভিতরে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও লুটপাটের পর অগ্নিকাণ্ড ঘটায়, যার ফলে বহু কম্পিউটার, ফাইল ও অফিস সরঞ্জাম ধ্বংস হয়। এই হামলায় কোনো প্রাণহানি না হলেও, প্রতিষ্ঠানের কাজের ধারায় বড় ক্ষতি হয়।
প্রদর্শনীটি বিশিষ্ট শিল্পী মাহ্বুবুর রহমানের উদ্যোগে গৃহীত হয়েছে। তিনি ধ্বংসাবশেষকে শিল্পের মাধ্যমে পুনর্গঠন করে, সমাজের স্মৃতিতে স্থায়ী করার চেষ্টা করছেন। তার মতে, শিল্পকর্মের মাধ্যমে ভয়াবহতা ও পুনর্জন্মের বার্তা পৌঁছানো সম্ভব।
‘আলো’ প্রদর্শনী ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে। প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে ১টা এবং বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত সর্বসাধারণের জন্য প্রবেশযোগ্য থাকবে। এই সময়সূচি দর্শকদের যথাযথ সময়ে প্রদর্শনী দেখতে সুবিধা দেবে।
প্রদর্শনীতে স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদারও উপস্থিত ছিলেন। তিনি শিল্পকর্মের পরিবেশগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করে, ধ্বংসের ফলে পরিবেশে সৃষ্ট প্রভাব ও পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা নিয়ে মন্তব্য করেন।
দর্শক ও বিশ্লেষকরা একমত যে, এই ধরনের স্মৃতি সংরক্ষণমূলক উদ্যোগ সমাজের সচেতনতা বাড়াবে এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ হিংসা রোধে প্রয়োজনীয় সতর্কতা প্রদান করবে।
প্রথম আলো ভবনের ধ্বংসাবশেষকে শিল্পের মাধ্যমে পুনর্গঠন করা এবং তা জনসাধারণের সামনে উপস্থাপন করা, দেশের সাংস্কৃতিক ও সাংবাদিক স্বাধীনতার রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই প্রদর্শনীটি ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে নথিভুক্ত করে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সত্যের স্মৃতি অমলিন থাকে।



