দক্ষিণ আফ্রিকার কুয়াজুলু-নাটাল প্রদেশে পা-থুক রোগ (Foot‑and‑Mouth Disease) এর বিস্তার বাড়ার ফলে স্থানীয় কৃষকরা তাদের গবাদি পশুর ক্ষতি ও অর্থনৈতিক ক্ষতির ঝুঁকিতে পড়েছেন। রোগটি গত এক বছরে দেশের নয়টি প্রদেশের আটটিতে ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রাণীর গোষ্ঠীকে ধ্বংস করে তুলেছে, ফলে অনেক গরু ও ভেড়া হত্যা করা হয়েছে রোগের বিস্তার রোধে।
পা-থুক রোগ একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাস, যা সরাসরি প্রাণীর সংস্পর্শ, দূষিত খাবার বা পানির মাধ্যমে ছড়ায়। গরু, ছাগল ও ভেড়ার মুখের ভিতরে ও পায়ের নখের নিচে ব্যথাযুক্ত ফোস্কা তৈরি হয়, যা তাদের চলাচল ও খাবার গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে। যদিও মানুষকে এই ভাইরাসে আক্রান্ত করে না, তবে প্রাণীর দুধ ও মাংসের উৎপাদন কমে যায় এবং কখনো কখনো তরুণ প্রাণী মারা যায়।
দক্ষিণ আফ্রিকায় এই রোগের বিস্তার কৃষি খাতের ওপর বড় প্রভাব ফেলেছে, যদিও কৃষি মোট জিডিপির তুলনায় ছোট অংশ, তবু গ্রামীণ এলাকায় এটি প্রধান কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয়ের উৎস। রোগের কারণে গবাদি পশুর রপ্তানি সীমাবদ্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয় হ্রাসের সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে। কুয়াজুলু-নাটাল প্রদেশ দেশের দুগ্ধ শিল্পের কেন্দ্র, যেখানে গরু পালনের ঐতিহ্যবাহী চারণভূমি ও সবুজ পাহাড়ে গরু ঘাস খায়।
রোগের বিস্তার রোধে ফার্মে প্রবেশদ্বারে জীবাণুমুক্তিকরণ স্টেশন স্থাপন, গাড়ি ও গবাদি পশুর চলাচল সীমিত করা এবং রোডব্লক প্রয়োগ করা হয়েছে। তবে এই ব্যবস্থা সবসময় কার্যকর হয়নি, ফলে রোগের সংক্রমণ এখনও নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
একটি বড় বাণিজ্যিক ফার্মে, ক্যারল হিউস্টন ও তার স্বামী পরিচালিত গবাদি পশু গোষ্ঠী গত মাসে রোগে আক্রান্ত হয়েছে। হিউস্টন জানান, তাদের কর্মীরা ৫০টি গরুতে মস্তিসের লক্ষণ ও চলাচলে অক্ষমতা লক্ষ্য করেন। রোগের বিস্তার রোধে তারা প্রতিটি গরুর জন্য প্রায় ৩৮০ ডলার (প্রায় ২৮০ পাউন্ড) ব্যয় করে অ্যান্টিবায়োটিকসহ চিকিৎসা চালিয়ে গেছেন।
হিউস্টনের ফার্মে দুধ উৎপাদনও দ্রুত হ্রাস পেয়েছে। রোগের প্রাদুর্ভাবের কয়েক দিন পর গড়ে দৈনিক ১৪,০০০ লিটার দুধ উৎপাদন থেকে কমে ৯,০০০ লিটারে নেমে আসে, কারণ আক্রান্ত গরু কম খাবার গ্রহণ করে এবং দুধ উৎপাদনে অক্ষম হয়।
দক্ষিণ আফ্রিকান সরকার রোগকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে। যদিও কৃষি খাতের মোট অবদান সীমিত, তবে গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয়ের জন্য এই খাতের গুরুত্ব অপরিসীম।
বহিরাগত বাজারে রোগের ঝুঁকি নিয়ে অন্যান্য দেশ গবাদি পশু পণ্য আমদানি বন্ধের সম্ভাবনা প্রকাশ করেছে, যা স্থানীয় কৃষকদের জন্য আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে। ফার্মের মালিকদের মতে, রপ্তানি বন্ধ হলে গরু বিক্রি ও দুধ বিক্রয় উভয়ই প্রভাবিত হবে, ফলে জীবিকায় বড় ধাক্কা লাগতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে কৃষকরা সরকারী সহায়তা, রোগের দ্রুত সনাক্তকরণ ও কার্যকর বায়োসিকিউরিটি ব্যবস্থা চাচ্ছেন। একই সঙ্গে, রোগের বিস্তার রোধে গবাদি পশুর চলাচল সীমিত করা, পরিষ্কার পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ফার্মে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়া জরুরি।
পা-থুক রোগের নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তা ও গবেষণা চালিয়ে যাওয়া, পাশাপাশি স্থানীয় কৃষকদের সচেতনতা বৃদ্ধি করা ভবিষ্যতে রোগের পুনরাবৃত্তি রোধে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।



