ভারতে প্রতি বছর গৃহস্থালীর দান-দাতব্য কার্যক্রমের মোট মূল্য প্রায় ৫৪০ বিলিয়ন রুপি, যা প্রায় ছয় বিলিয়ন ডলারের সমান, বলে একটি নতুন গবেষণা প্রকাশ করেছে। এই গবেষণাটি অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর সোশ্যাল ইম্প্যাক্ট অ্যান্ড ফিল্যানথ্রপি (CSIP) পরিচালিত “হাউ ইন্ডিয়া গিভস ২০২৫” শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে। ফলাফল দেখায় যে দান-দাতব্যের প্রধান চালিকাশক্তি এখনো ধনী প্রতিষ্ঠানের বদলে সাধারণ গৃহস্থালিরই অবদান।
সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারী ৭,০০০-এরও বেশি পরিবারের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মোট গৃহস্থালীর ৬৮ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে দান করে। এদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক পরিবার (৪৮%) খাবার, পোশাক বা অন্যান্য গৃহস্থালির সামগ্রী আকারে অবদান রাখে। নগদ দান ৪৪ শতাংশ এবং স্বেচ্ছাসেবী কাজ ৩০ শতাংশের কাছাকাছি।
খাবার দানের বেশিরভাগই সম্প্রদায়িক রন্ধনশালা বা ফ্রি কিচেনে পৌঁছে, যেখানে দরিদ্রদের জন্য বিনামূল্যে খাবার সরবরাহ করা হয়। স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমের প্রধান ক্ষেত্র ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সেবা, যার মধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ত্রাণ কাজ অন্তর্ভুক্ত। এই ধরনের কাজগুলো প্রায়শই মুখোমুখি আবেদন এবং ধর্মীয় দায়িত্ববোধের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়।
গবেষণাটি ভারতের জাতীয় নমুনা জরিপ (NSS) এর ভোগ্যপণ্যের তথ্যের সঙ্গে যুক্ত করে গৃহস্থালির আয় স্তর অনুযায়ী দানের ধরণ বিশ্লেষণ করেছে। ফলে দেখা যায়, উচ্চ আয়ের পরিবারগুলোও নগদ দান বেশি করে, তবে নিম্ন আয়ের গোষ্ঠী বেশি করে সামগ্রী ও সেবা প্রদান করে। দানের প্রবণতা সব আয় স্তরে সমানভাবে বিস্তৃত, যা দেশের দাতব্য সংস্কৃতির ব্যাপকতা নির্দেশ করে।
প্রতিবেদনটি উল্লেখ করেছে যে, পূর্বে দান-দাতব্যের চিত্র প্রধানত কর্পোরেট সামাজিক দায়িত্ব (CSR) এবং ধনী ব্যক্তির বড় দানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। তবে বাস্তবে গৃহস্থালির ছোটখাটো অবদানগুলো মিলিয়ে মোট দানের পরিমাণকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। এই তথ্য দাতব্য নীতিনির্ধারক ও সামাজিক সংস্থার জন্য নতুন দৃষ্টিকোণ উন্মোচন করে।
গৃহস্থালির দান-দাতব্যের পরিসর নগদ, সামগ্রী এবং স্বেচ্ছাসেবী কাজের সমন্বয়ে গঠিত, যা সামাজিক সংহতি ও পারস্পরিক সহায়তার ভিত্তি গড়ে তোলে। বিশেষ করে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বেচ্ছাসেবী কাজের সংখ্যা বেশি, যা ধর্মীয় উৎসব ও রীতি-নীতির সঙ্গে যুক্ত। এই ধরণটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সমানভাবে দেখা যায়।
সমীক্ষা অনুসারে, গৃহস্থালির দান-দাতব্যের মোট পরিমাণের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই সামগ্রী রূপে, যা খাদ্য নিরাপত্তা ও মৌলিক চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নগদ দান যদিও কম শতাংশে, তবু তা জরুরি আর্থিক সহায়তা হিসেবে কাজ করে। স্বেচ্ছাসেবী কাজের মাধ্যমে মানবিক সেবা ও প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়।
এই গবেষণার ফলাফল দেখায় যে, দানের প্রেরণা প্রধানত সামাজিক দায়িত্ববোধ, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং পারস্পরিক সহায়তার ইচ্ছা। পরিবারগুলো প্রায়শই মুখোমুখি অনুরোধ বা প্রতিবেশীর প্রয়োজনের ভিত্তিতে দান করে, যা স্থানীয় স্তরে দাতব্য কার্যক্রমকে শক্তিশালী করে।
গৃহস্থালির দান-দাতব্যের পরিমাণ ও প্রকারভেদ সম্পর্কে এই বিশদ তথ্য নীতি নির্ধারককে লক্ষ্যভিত্তিক প্রোগ্রাম তৈরি করতে সহায়তা করবে। উদাহরণস্বরূপ, খাদ্য দানের জন্য সরকারি রন্ধনশালার সঙ্গে সমন্বয় করা বা স্বেচ্ছাসেবী প্রশিক্ষণকে সমর্থন করা যেতে পারে।
দাতব্য সংস্থাগুলোও এই তথ্য ব্যবহার করে তাদের তহবিল সংগ্রহের কৌশল পুনর্গঠন করতে পারে, যাতে গৃহস্থালির ছোটখাটো অবদানগুলোকে বৃহত্তর প্রকল্পে সংযুক্ত করা যায়। এতে দানের প্রভাব বাড়বে এবং দাতব্য কার্যক্রমের টেকসইতা নিশ্চিত হবে।
এই গবেষণা ভারতের দান-দাতব্যের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, যেখানে গৃহস্থালির ভূমিকা কেন্দ্রীয় হয়ে ওঠে। এটি দেখায় যে, দেশের দাতব্য সংস্কৃতি কেবল ধনী ও প্রতিষ্ঠানের নয়, বরং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ।
পাঠক হিসেবে আমাদের উচিত স্থানীয় দাতব্য কার্যক্রমে সক্রিয় অংশগ্রহণ করা এবং পারিবারিক দানের সংস্কৃতি বজায় রাখা। গৃহস্থালির ছোটখাটো অবদানও সমষ্টিগতভাবে দেশের সামাজিক মঙ্গলের জন্য বড় ভূমিকা রাখে। এই তথ্য আমাদেরকে দানের গুরুত্ব পুনর্বিবেচনা করতে এবং নিজের দায়িত্ববোধকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করবে।



