রাশিয়া সরকারের সামরিক অভিযানে অংশ নিতে সেডাঙ্কা গ্রাম থেকে প্রায় সব পুরুষ ১৮ থেকে ৫৫ বছর বয়সের লোক শিপাই হিসেবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দিকে রওনা হয়েছে। মোট ৩৯ জন গ্রামবাসী চুক্তি স্বাক্ষর করে যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়েছেন, যার মধ্যে ১২ জন নিহত এবং আরও সাতজন নিখোঁজ।
সেডাঙ্কা রাশিয়ার দূরপ্রান্তের ফার ইস্টে অবস্থিত একটি ছোট মাছধরা গ্রাম, যেখানে অধিকাংশ বাড়িতে স্বয়ংক্রিয় পানির সরবরাহ, ইনডোর টয়লেট বা কেন্দ্রীয় তাপ ব্যবস্থা নেই। শীতকালে তাপমাত্রা প্রায় -১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে যায়, ফলে শীতকালীন জীবনের কঠিনতা বাড়ে।
গ্রামটি বনের টুন্ড্রা ও জলাভূমি দিয়ে ঘেরা, এবং মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত নদীর নৌকা বা ট্র্যাকযুক্ত গাড়ি দিয়েই জেলা কেন্দ্রের সঙ্গে সংযোগ থাকে। শীতকালে শুধুমাত্র স্নোমোবাইল বা হেলিকপ্টারই পৌঁছাতে পারে, যা পরিবহনকে আরও সীমিত করে।
স্থানীয় কর্মসংস্থানের সুযোগ কম, তাই অধিকাংশ বাসিন্দা মাছ ধরা এবং নিজেরা চাষ করা খাবার দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে। ইলিশ, স্যামন এবং অন্যান্য তাজা মাছ গ্রামবাসীর প্রধান আহার, আর শীতের জন্য গাছের কাঠ সংগ্রহ করাও গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
যুদ্ধের জন্য প্রায় সব পুরুষ গ্রাম ছেড়ে যাওয়ায় পরিবারগুলোতে গভীর শূন্যতা দেখা দেয়। এক গ্রামবাসী, যিনি নিরাপত্তার জন্য নাম পরিবর্তন করেছেন, বলছেন, “অনেক মানুষ মারা গেছে, আমাদের গৃহে শোকের ছায়া ছড়িয়ে আছে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, তার বোনের স্বামী এবং আত্মীয়রা সামনের সারিতে লড়াই করছে, এবং প্রায় প্রতিটি পরিবারের কেউ না কেউ যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছে।
সেডাঙ্কা কামচাটকা উপদ্বীপের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে, ওখোটস্ক সাগরের কাছাকাছি অবস্থিত। এখানে থেকে ইউক্রেনের সামরিক লাইন পর্যন্ত দূরত্ব প্রায় ৪,৩০০ মাইল (৭,০০০ কিলোমিটার), যা আমেরিকার অ্যানকোরেজ শহরের অর্ধেক দূরত্বের সমান। এই ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা গ্রামবাসীর জন্য যুদ্ধের বাস্তবতা আরও দূরবর্তী করে তুললেও, তাদের অংশগ্রহণের হার উচ্চ।
গ্রাম থেকে মোট ৩৯ জন পুরুষ রাশিয়া সরকারের সঙ্গে চুক্তি করে যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়েছেন, যা মোট ২৫৮ জনের মধ্যে প্রায় ১৫%। এর মধ্যে ১২ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে, আর সাতজন এখনও নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত। এই সংখ্যা গ্রামটির জনসংখ্যা হ্রাসের সরাসরি কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মার্চ ২০২৪-এ আঞ্চলিক গভর্নরের সফরের সময়, গ্রামটির নারীরা একত্রে জানান যে “বিশেষ সামরিক অভিযান”ে তাদের সব পুরুষই অংশ নিয়েছে। তারা উল্লেখ করেন, শীতের জন্য কাঠ কাটা কাজের জন্য আর কেউ নেই, ফলে গরমের জন্য জ্বালানি সংগ্রহে বড় সমস্যার মুখোমুখি। এই বক্তব্যটি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত হয়।
রাশিয়া সরকারের সামরিক কার্যক্রমের ফলে রাশিয়ার সামরিক ক্ষতি বাড়ছে। ২০২৫ সালে রাশিয়া সরকারের আনুমানিক ৪০,২০১ সৈন্যের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে, এবং বিশ্লেষকরা অনুমান করেন যে মোট মৃত্যু সংখ্যা ৮০,০০০-এ পৌঁছাতে পারে, যা ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২ থেকে শুরু হওয়া পূর্ণ-স্কেল আক্রমণের পর সর্বোচ্চ বছর হতে পারে।
সেডাঙ্কা গ্রাম থেকে প্রেরিত এই তথ্যগুলো রাশিয়া সরকারের সামরিক নীতির প্রভাবকে গ্রামীণ এলাকায় কীভাবে প্রকাশ করে তা স্পষ্ট করে। গ্রামটির অবকাঠামোগত দুর্বলতা, সীমিত অর্থনৈতিক সুযোগ এবং শীতকালীন কঠিন পরিবেশের সঙ্গে মিলিয়ে, যুদ্ধের মানবিক দিকটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এই পরিস্থিতি রাশিয়া সরকারের সামরিক অভিযান এবং গ্রামীণ সম্প্রদায়ের মধ্যে জটিল সম্পর্ককে তুলে ধরে, যেখানে জাতীয় নীতি স্থানীয় জীবনের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। গ্রামবাসীর দৈনন্দিন সংগ্রাম এবং যুদ্ধের পরিণতি একসাথে দেখা যায়, যা ভবিষ্যতে রাশিয়া সরকারের কূটনৈতিক ও সামরিক কৌশল পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।



