ইতালীয়-অস্ট্রিয়ান পরিচালনা জুটি টিজা কোভি ও রেইনার ফ্রিমেলের যৌথ কাজ ‘দ্য লোনেলিস্ট ম্যান ইন টাউন’ ২০২৪ সালের বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রতিযোগিতামূলক বিভাগে প্রথম প্রদর্শনী পেল। ছবিটি ৮০ বছর বয়সী ভিয়েনার ব্লুজ গায়ক আলয়স কোচ, যিনি আল কুক নামেও পরিচিত, তার জীবনের শেষ পর্যায়ের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। চলচ্চিত্রটি ১ ঘণ্টা ২৬ মিনিটের সময়কাল নিয়ে গঠিত এবং বাস্তব ঘটনার ওপর ভিত্তি করে ডকুড্রামা শৈলীতে নির্মিত।
ফিল্মটি প্রচলিত ডকুমেন্টারির চেয়ে নাট্যিক উপাদান যুক্ত করে আল কুকের দৈনন্দিন জীবনকে চিত্রায়িত করেছে। পরিচালকরা তার অতীতের সোনালী স্মৃতি ও বর্তমানের কঠিন বাস্তবতার মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য তুলে ধরতে চেয়েছেন। তবে এই পদ্ধতি কিছু সমালোচককে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে যে, ন্যূনতম নাট্যিক উপাদান দিয়ে দীর্ঘমেয়াদী চলচ্চিত্রের কাঠামো তৈরি করা সম্ভব কিনা।
আল কুকের গল্প ভিয়েনার এক পুরনো, ধ্বংসের পথে থাকা অ্যাপার্টমেন্টে শুরু হয়। তিনি একা বসবাস করেন, যেখানে তার সঙ্গীতের রেকর্ড, পুরনো গিটার এবং বহু বছরের সংগ্রহের স্মারকগুলো ঘরে ছড়িয়ে আছে। তার বাড়িটি শহরের পুনর্নির্মাণ পরিকল্পনার আওতায় রয়েছে, ফলে তাকে শীঘ্রই তার প্রিয় বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। এই বাস্তবিক সমস্যাই ছবির মূল কাঠামো গঠন করে।
কুকের সঙ্গীতিক যাত্রা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের অস্ট্রিয়ায় শুরু হয়। তিনি আমেরিকান ব্লুজ, রকাবিলি ও রক অ্যান্ড রোলের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে নিজস্ব শৈলী গড়ে তোলেন। রবার্ট জনসন, মা রেইনি এবং এলভিস প্রেসলির মতো কিংবদন্তি শিল্পীর প্রভাব তার গানের স্বরে স্পষ্টভাবে শোনা যায়। তিনি এখনও রকাবিলি পোম্পাদোর চুলের স্টাইল বজায় রাখেন এবং একবার বলেছিলেন যে, ইংরেজি শিখতে তিনি এলভিসের পুরনো সাক্ষাৎকার বারবার শুনেছেন।
চলচ্চিত্রটি আল কুকের দৈনন্দিন রুটিন, তার রেকর্ড সংগ্রহের যত্ন এবং পুরনো সঙ্গীতের প্রতি তার আবেগকে নীরবভাবে অনুসরণ করে। পরিচালকরা কোনো অতিরিক্ত নাট্যিক দৃশ্য যোগ না করে, তার জীবনের স্বাভাবিক প্রবাহকে ক্যামেরার সামনে তুলে ধরেছেন। ফলে দর্শককে তার সঙ্গে একধরনের নীরব সংলাপের অনুভূতি হয়, যেখানে প্রতিটি শট তার একাকিত্ব ও স্মৃতির গভীরতা প্রকাশ করে।
কুকের বাড়ি ধ্বংসের পথে থাকায় তাকে তার স্মৃতিচিহ্নগুলো ছেড়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় থিম। তিনি ধীরে ধীরে পুরনো রেকর্ড, গিটার ও ফটো অ্যালবামগুলোকে বিক্রি বা দান করার সিদ্ধান্ত নেন, যা তার জীবনের শেষ অধ্যায়ের সূচনা করে। এই পরিবর্তন প্রক্রিয়ায় তিনি নিজের অতীতের সঙ্গে বিদায় জানাতে বাধ্য হন, যা ছবিতে নরমভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।
দৃশ্যমান দিক থেকে ছবিটি মিনি-মালিস্টিক শৈলীতে নির্মিত, যেখানে রঙের ব্যবহার সীমিত এবং ক্যামেরা কাজ সরল। ভিয়েনার পুরনো ইটের গলির গন্ধ, ধূসর আকাশ এবং ধ্বংসাবশেষের মধ্যে আল কুকের সুরের মেলডি একসাথে মিশে যায়। এই ভিজ্যুয়াল পদ্ধতি দর্শকের মধ্যে নস্টালজিয়া ও সহানুভূতির মিশ্র অনুভূতি জাগায়।
সমালোচকরা ছবির কিছু অংশকে প্রশংসা করেছেন, বিশেষ করে কুকের জীবনের নীরব মুহূর্তগুলোকে সংবেদনশীলভাবে ধরার জন্য। তবে একই সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ছবির দৈর্ঘ্য ও বিষয়বস্তুর পুনরাবৃত্তি কখনও কখনও অতিরিক্ত দীর্ঘায়িত হয়ে যায়, ফলে পুরো চলচ্চিত্রটি একঘেয়ে হয়ে পড়তে পারে। নস্টালজিক মুহূর্তগুলো যদিও হৃদয়স্পর্শী, তবে সেগুলো এককথায় পুরো চলচ্চিত্রকে সমর্থন করতে যথেষ্ট নয়।
টিজা কোভি ও রেইনার ফ্রিমেল পূর্বে ‘দ্য ড্রাইভিং লেসনস’ ও ‘অ্যান্টি-ড্রাগ’ মতো ডকুমেন্টারি-ড্রামা শৈলীর কাজের জন্য পরিচিত। ‘দ্য লোনেলিস্ট ম্যান ইন টাউন’ তাদের শৈলীর ধারাবাহিকতা বজায় রেখে, বাস্তব জীবনের চরিত্রকে নাট্যিক কাঠামোর সঙ্গে মিশ্রিত করার চেষ্টা করেছে। অস্ট্রিয়ার পোস্ট-ওয়ার পোস্ট-ইন্ডাস্ট্রিয়াল পরিবেশে গড়ে ওঠা এই চলচ্চিত্রটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে স্থান পেয়ে, অস্ট্রিয়ান সংস্কৃতির এক অনন্য দিককে বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপন করেছে।
শেষে, ‘দ্য লোনেলিস্ট ম্যান ইন টাউন’ এমন দর্শকদের জন্য উপযুক্ত যারা বাস্তব জীবনের গল্পে গভীরতা ও নীরবতা খুঁজে পান। ছবিটি আল কুকের একাকিত্ব, স্মৃতি ও পরিবর্তনের সঙ্গে সংগ্রামকে সংবেদনশীলভাবে উপস্থাপন করে, যদিও নাট্যিক উত্তেজনার অভাব কিছু দর্শকের জন্য বিরক্তিকর হতে পারে। বার্লিনের বড় পর্দায় এই চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী অস্ট্রিয়ান সঙ্গীতের ইতিহাস ও মানবিক গল্পের সংমিশ্রণকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ দেয়।



