স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা এক ধরনের নাসাল স্প্রে ভ্যাকসিন বিকাশ করেছেন, যা শ্বাসযন্ত্রের বিভিন্ন ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ থেকে রক্ষা করার সম্ভাবনা দেখিয়েছে। পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই একক টিকাদান শীতল, জ্বর, কাশি ও ফ্লু সহ বেশ কয়েকটি রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে পারে এবং অ্যালার্জি উপশমেও ভূমিকা রাখতে পারে। বর্তমানে প্রাণী মডেলে ফলাফল নিশ্চিত হয়েছে, তবে মানব পর্যায়ের ক্লিনিকাল পরীক্ষা এখনও বাকি।
প্রচলিত টিকাদানগুলো একক রোগের জন্যই তৈরি হয়; উদাহরণস্বরূপ, হাম টিকাদান শুধুমাত্র হামের বিরুদ্ধে, চিকেনপক্স টিকাদান কেবল চিকেনপক্সের জন্য কার্যকর। এই পদ্ধতি প্রায় দুই শতাব্দী ধরে অটল রয়ে এসেছে, যা এডওয়ার্ড জেনার ১৮শ শতাব্দীর শেষের কাজের ধারাবাহিকতা। স্ট্যানফোর্ডের নতুন পদ্ধতি এই ঐতিহ্যকে সম্পূর্ণভাবে বদলে দেয়, কারণ এটি রোগের বিরুদ্ধে প্রশিক্ষণ নয়, বরং ইমিউন কোষের পারস্পরিক যোগাযোগকে অনুকরণ করে।
টিকাটি নাসারন্ধ্রের মাধ্যমে স্প্রে করা হয়, ফলে ফুসফুসের ম্যাক্রোফেজ নামে পরিচিত সাদা রক্তকণিকা সক্রিয় অবস্থায় থাকে। এই অবস্থায় তারা যেকোনো আক্রমণকারীকে দ্রুত শনাক্ত করে এবং প্রতিক্রিয়া জানাতে প্রস্তুত থাকে। প্রাণী পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই সক্রিয় অবস্থা প্রায় তিন মাস পর্যন্ত টিকে থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা নিশ্চিত করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, সক্রিয় ম্যাক্রোফেজের উপস্থিতিতে শ্বাসযন্ত্রে প্রবেশ করা ভাইরাসের সংখ্যা ১০০ থেকে ১,০০০ গুণ কমে যায়। যদিও কিছু ভাইরাস ফুসফুসে প্রবেশ করতে পারে, তবুও পুরো ইমিউন সিস্টেম দ্রুত কাজ করে, ফলে সংক্রমণ দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসে। স্ট্যানফোর্ডের মাইক্রোবায়োলজি ও ইমিউনোলজি বিভাগের অধ্যাপক বালি পুলেন্দ্রান উল্লেখ করেছেন, এই টিকাদান ফ্লু, কোভিড, সাধারণ সর্দি সহ বিভিন্ন ভাইরাস এবং পরীক্ষিত ব্যাকটেরিয়া প্রজাতির বিরুদ্ধে সুরক্ষা প্রদান করে।
বিশেষভাবে, টিকাটি স্ট্যাফিলোকক্কাস অরিয়াস এবং অ্যাসিনেটোব্যাক্টার বাউম্যানি নামের দুইটি রোগজনক ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। এই ব্যাকটেরিয়া শ্বাসযন্ত্রের গুরুতর সংক্রমণ সৃষ্টি করতে পারে, যা প্রায়শই অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতিরোধের মুখে থাকে। টিকাটির বিস্তৃত সুরক্ষা ক্ষমতা ভবিষ্যতে অ্যান্টিবায়োটিকের ওপর নির্ভরতা কমাতে সহায়তা করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা এই গবেষণাকে “খুবই উত্তেজনাপূর্ণ” বলে উল্লেখ করেছেন, যদিও এটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তারা মনে করেন, যদি মানব পরীক্ষায় একই ফলাফল পাওয়া যায়, তবে এটি টিকাদানের ইতিহাসে একটি বড় অগ্রগতি হতে পারে। বর্তমানে টিকাটির নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে ক্লিনিকাল ট্রায়াল পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
টিকাটির নাসাল স্প্রে ফর্মুলা ব্যবহারকারীকে ইনজেকশন থেকে মুক্তি দেয়, যা টিকাদানের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের জন্য নাসাল স্প্রে সহজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে, ফলে টিকাদান কভারেজ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
গবেষকরা আরও উল্লেখ করেছেন, এই পদ্ধতি অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া কমাতে সহায়তা করতে পারে, যদিও এ বিষয়ে বিস্তারিত গবেষণা এখনো বাকি। অ্যালার্জি রোগীর জন্য অতিরিক্ত সুরক্ষা প্রদান করা সম্ভব হতে পারে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
স্ট্যানফোর্ডের দল ভবিষ্যতে এই ভ্যাকসিনকে বিভিন্ন ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে পরীক্ষা করতে পরিকল্পনা করেছে, যাতে তা বহুমুখী রোগের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ সুরক্ষা দিতে পারে। একই সঙ্গে, টিকাটির দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ও সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহের জন্য দীর্ঘমেয়াদী পর্যবেক্ষণ চালু করা হবে।
এই গবেষণার ফলাফল বিজ্ঞান জার্নাল “সায়েন্স”-এ প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে পদ্ধতি, ফলাফল ও সম্ভাব্য প্রয়োগের বিশদ বিবরণ দেওয়া হয়েছে। প্রকাশনায় উল্লেখ করা হয়েছে, টিকাটির কার্যকারিতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মানব পর্যায়ের ক্লিনিকাল ট্রায়াল অপরিহার্য।
যদি ভবিষ্যতে মানব পরীক্ষায় একই রকম সুরক্ষা পাওয়া যায়, তবে এই একক ভ্যাকসিন বিশ্বব্যাপী শ্বাসযন্ত্রের রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। বিশেষ করে মৌসুমী সর্দি-ফ্লু, কোভিড-১৯ এবং ব্যাকটেরিয়াল নিউমোনিয়া মতো রোগের প্রাদুর্ভাব কমাতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অবশেষে, গবেষকরা জনসাধারণকে এই নতুন পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতন হতে এবং ভবিষ্যতে টিকাদান নীতি গঠনে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে আহ্বান জানিয়েছেন। আপনার স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য নতুন বিকল্পের অপেক্ষা করুন, এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মেনে চলুন।



