লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা উপজেলার উত্তর জাওরানি গ্রামে ৩০ বছর বয়সী নুরুজ্জামান ওরফে আনোয়ার, তিনবারের বিয়ের পর আর কখনো বিবাহ না করার শপথ প্রকাশ করেন। তিনি বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি দুপুরে নিজের বাড়ির আঙিনায় দুধ দিয়ে গোসল করে এই প্রতিজ্ঞা জনসমক্ষে জানিয়ে দেন। উপস্থিত গ্রামবাসী ও আত্মীয়স্বজনেরা এই অস্বাভাবিক ঘোষণার সাক্ষী হন। ঘটনাটি দ্রুত স্থানীয় মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে এবং সামাজিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
আনোয়ার প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় বিবাহ প্রত্যেকটি দাম্পত্য জীবনের ভাঙনের সঙ্গে শেষ হয়েছে; প্রতিটি বিচ্ছেদের পর তিনি পুনরায় বিবাহের পথে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেন। তবে এইবার তিনি চূড়ান্তভাবে একা জীবন বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং তা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন। তার এই সিদ্ধান্তের পেছনে পূর্বের ব্যর্থ বিবাহগুলোর অভিজ্ঞতা ও দুঃখের স্মৃতি রয়েছে।
দুধের গোসলের আগে তার শরীরে হলুদ মাখানো হয়, যা স্থানীয় রীতিতে শুদ্ধিকরণ ও শুভতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। হলুদের গন্ধ ও রঙের সঙ্গে দুধের স্বচ্ছতা মিলিয়ে তিনি নিজেকে শারীরিক ও মানসিকভাবে পরিষ্কার করার প্রচেষ্টা করেন। গোসলের পর তিনি তওবা করে আর কখনো বিয়ে না করার শপথ করেন, যা উপস্থিত সকলের সামনে উচ্চস্বরে পুনরাবৃত্তি করা হয়।
বিবাহের মতোই অনুষ্ঠানটি সাজানো হয়; বাড়ির সামনে সামিয়ানা টাঙিয়ে গেট ও প্যান্ডেল গড়ে তোলা হয় এবং রঙিন কাপড় দিয়ে সজ্জা করা হয়। অতিথিদের জন্য কাঠের চেয়ার ও পাটের ম্যাটের ব্যবস্থা করা হয়, যেখানে গ্রামবাসীরা বসে অনুষ্ঠানটি পর্যবেক্ষণ করে। মোট প্রায় পঞ্চাশজনের উপস্থিতি ছিল, যার মধ্যে নিকট আত্মীয়, প্রতিবেশী এবং গ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে তিনটি ছাগল কোরবানি করা হয় এবং কোরবানি মাংস স্থানীয় খাবার হিসেবে অতিথিদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। ছাগলগুলোকে ধর্মীয় রীতি অনুসারে শুদ্ধিকরণ করা হয় এবং পরে গ্রিল করে সরাসরি অতিথিদের পরিবেশন করা হয়। এই প্রথা গ্রাম্য রীতিতে বিশেষ উপলক্ষ্যে করা হয় এবং উপস্থিতদের মধ্যে ভাগাভাগি করার মাধ্যমে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে কাজ করে।
আনোয়ার স্পষ্টভাবে বলেন, “আমি আর কখনো বিয়ে করব না এবং নারীদের প্রতি কোনো আকর্ষণ থাকবে না।” তিনি অতীতে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে স্বীকার করেন এবং এখন সেই অবৈধ কাজ থেকে সরে গিয়ে সৎ জীবনে অগ্রসর হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তার এই পরিবর্তনকে তিনি আত্মিক পুনর্জন্মের একটি ধাপ হিসেবে বর্ণনা করেন। ভবিষ্যতে তিনি কৃষিকাজ ও ছোট ব্যবসা চালিয়ে নিজের জীবিকা গড়ে তুলতে চান।
স্থানীয় মানুষদের মধ্যে এই অস্বাভাবিক শপথ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়; কিছু লোক তাকে সাহসিকতার প্রশংসা করে এবং তার সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার উদাহরণ হিসেবে স্বাগত জানায়। অন্যদিকে কিছু গ্রামবাসী তার এই অচল সিদ্ধান্তকে অযৌক্তিক বলে সমালোচনা করে এবং ভবিষ্যতে তার একাকিত্বের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। তবে অধিকাংশই ঘটনাটিকে শান্তিপূর্ণভাবে গ্রহণ করেছে এবং অনুষ্ঠানের শেষে একসাথে খাবার ভাগ করে আনন্দ ভাগাভাগি করেছে।
বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে বিবাহকে সামাজিক স্থিতিশীলতার মূল স্তম্ভ হিসেবে দেখা হয়, তাই একাধিক বিয়ের পর চূড়ান্তভাবে অবিবাহিত থাকার ঘোষণা অস্বাভাবিক বলে গণ্য হয়। এই ধরনের প্রকাশ্য শপথ সামাজিক নিয়মের সীমা পরীক্ষা করে এবং ব্যক্তিগত পছন্দের স্বায়ত্তশাসনকে সামনে নিয়ে আসে। গ্রাম্য সংস্কৃতিতে এমন প্রকাশের ফলে পারিবারিক কাঠামোর পুনঃমূল্যায়ন ঘটতে পারে।
এই ঘটনা ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও সামাজিক প্রত্যাশার মধ্যে সংঘাতের উদাহরণ হিসেবে নজরে আসে এবং স্থানীয় মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এটি আত্মপ্রকাশের নতুন পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। একই সঙ্গে এটি সামাজিক নীতি ও রীতির পরিবর্তনের সূচক হিসাবেও দেখা যায়।
স্থানীয় প্রশাসন ঘটনাটিকে শান্তিপূর্ণভাবে পরিচালনা করেছে এবং কোনো আইনগত বাধা বা নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমস্যা রিপোর্ট করা হয়নি। গ্রামপুলিশের উপস্থিতি মূলত জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ছিল এবং কোনো বিরোধের উদ্ভব রোধ করেছে। প্রশাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ধরনের ব্যক্তিগত শপথকে সীমাবদ্ধ করা প্রয়োজনীয় নয়, যতক্ষণ তা জনশান্তি ব্যাহত না করে।
আনোয়ার ভবিষ্যতে কীভাবে তার সিদ্ধান্ত বজায় রাখবেন তা এখনো অনিশ্চিত, তবে তিনি ইতিমধ্যে তার পূর্বের অবৈধ কাজ থেকে দূরে থাকার এবং সৎ উপায়ে জীবিকা অর্জনের পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন। তিনি স্থানীয় কৃষি প্রকল্পে অংশ নিতে এবং ছোটখাটো ব্যবসা চালু করতে ইচ্ছুক, যা তার আর্থিক স্বাবলম্বিতা বাড়াবে। তার এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রাম্য যুবকদের জন্য একটি রোল মডেল হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, দুধ গোসলের মাধ্যমে আজীবন অবিবাহিত শপথ নেওয়া এই ঘটনা গ্রাম্য সমাজে ব্যক্তিগত পছন্দের প্রকাশের নতুন রূপ হিসেবে উদ্ভাসিত হয়েছে এবং সামাজিক নিয়মের পুনঃপর্যালোচনার দরজা খুলে দিয়েছে। স্থানীয় জনগণ ও প্রশাসন উভয়ই এই ঘটনাকে শান্তিপূর্ণভাবে গ্রহণ করেছে, যা ভবিষ্যতে অনুরূপ ব্যক্তিগত প্রকাশের জন্য একটি মডেল হিসেবে কাজ করতে পারে।



