মন্ট্রিয়াল ভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাতা অ্যালিসন ম্যাকআলপাইন তার নতুন শর্ট ফিল্ম ‘পারফেক্টলি এ স্ট্রেঞ্জনেস’ এর জন্য সর্বোচ্চ ডকুমেন্টারি শর্ট ক্যাটেগরিতে ওসকারের মনোনয়ন পেয়েছেন। চলচ্চিত্রটি চিলির আতাকামা মরুভূমিতে তিনটি গাধা পাহাড়ি পথে অগ্রসর হয়ে একটি পরিত্যক্ত জ্যোতির্বিদ্যাগত পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে পৌঁছানোর গল্প তুলে ধরে।
ফিল্মের কোনো কথোপকথন নেই এবং রাতের আকাশের নক্ষত্র ছাড়া অন্য কোনো ‘তারকা’ উপস্থিত হয় না। গাধাগুলোর ধীরগতি চলাচলকে ক্যামেরা অনুসরণ করে, দর্শককে দিন-রাতের পরিবর্তনে বিস্তীর্ণ পাথুরে শৃঙ্গ এবং মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সির চমকপ্রদ দৃশ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।
ম্যাকআলপাইন ২০১৭ সালে আতাকামা মরুভূমিতে শুট করা ‘সিয়েলো’ নামের ডকুমেন্টারি ফিচারটির পর এই নতুন প্রকল্পে হাত বাড়িয়ে দেন। ‘সিয়েলো’ তে তিনি প্রথমবার মরুভূমির পরিষ্কার আকাশে নক্ষত্রের নৃত্য দেখেছিলেন, যা তাকে মহাবিশ্বের সঙ্গে সরাসরি সংযোগের অনুভূতি দিয়েছিল। এই অভিজ্ঞতা ‘পারফেক্টলি এ স্ট্রেঞ্জনেস’ তৈরির মূল প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।
চলচ্চিত্রের নির্মাণে গাধাগুলোর স্বাভাবিক গতি ও শ্বাস-প্রশ্বাসকে ক্যামেরা ধরা দিয়ে, বিস্তীর্ণ পাথুরে ভূখণ্ডের সঙ্গে মিলিয়ে একটি ধ্যানমগ্ন পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। রাতের আকাশে ছড়িয়ে থাকা নক্ষত্রমণ্ডল এবং মিল্কি ওয়ের ঝলক দর্শকের মনে মহাবিশ্বের বিশালতা ও রহস্যের অনুভূতি জাগায়।
ফিল্মের অন্যতম চমকপ্রদ অংশ হল পারানাল পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের অভ্যন্তরীণ দৃশ্য। এই পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রটি ইউরোপীয় জ্যোতির্বিদদের একটি সমিতি পরিচালনা করে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,৬৩৫ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। ডিরেক্টর এই উচ্চতা ও শূন্যতা অনুভব করতে চেয়েছিলেন, যাতে দর্শকরা টেলিস্কোপের গম্বুজ ও রেডিও ডিশের বিশালতা অনুভব করতে পারে।
ম্যাকআলপাইন বলেন, “এই ধারণা একদমই স্বাভাবিক নয়; এটি ছিল এক অদ্ভুত পরিকল্পনা, তবে পথে যে মুহূর্তগুলোতে প্রকৃতি নিজেই আমাদের সঙ্গে কথা বলে, সেগুলোই আমাকে এগিয়ে নিতে উদ্বুদ্ধ করেছে।” তিনি আরও যোগ করেন, “যখন সূর্য অস্ত যায় এবং নক্ষত্রগুলো উদয় হয়, তখন গাধাগুলো যেন আকাশের দিকে তাকিয়ে নাচে, আর আমরা সেই নাচকে ফিল্মে ফুটিয়ে তুলেছি।”
ফিল্মের শুটিং প্রক্রিয়ায় গাধাগুলোকে কোনো স্ক্রিপ্ট বা নির্দেশনা না দিয়ে স্বাভাবিকভাবে চলতে দেওয়া হয়েছে। ফলে তাদের ধীর, তবে দৃঢ় গতি দর্শকের কাছে প্রকৃতির সঙ্গে একাত্মতার অনুভূতি দেয়। গাধাগুলো যখন পরিত্যক্ত রেডিও টেলিস্কোপের সামনে থামে, তখন ক্যামেরা তাদের চোখে প্রতিফলিত নক্ষত্রের ঝলক ধরতে সক্ষম হয়।
এই প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল আলো দূষণ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। ম্যাকআলপাইন জানিয়েছেন, আধুনিক শহরের আলো মানুষের চোখে নক্ষত্রের দৃশ্যমানতা কমিয়ে দেয়, আর আতাকামার পরিষ্কার আকাশে তিনি প্রথমবার যখন মহাজাগতিক নৃত্য দেখেছিলেন, তখন তার অনুভূতি ছিল “অত্যন্ত স্পর্শকাতর, যেন আমি নিজেই আকাশের মধ্যে আছি।”
‘পারফেক্টলি এ স্ট্রেঞ্জনেস’ ওসকারের মনোনয়ন পেয়েছে বলে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সমালোচকরা চলচ্চিত্রের সৃজনশীলতা ও ভিজ্যুয়াল বর্ণনা প্রশংসা করছেন। যদিও ফিল্মে কোনো কথোপকথন নেই, তবে গাধা ও মহাকাশের মধ্যে গড়ে ওঠা অদ্ভুত সংলাপ দর্শকের কল্পনাকে উদ্দীপিত করে।
এই স্বল্পদৈর্ঘ্য ডকুমেন্টারির মাধ্যমে ম্যাকআলপাইন দর্শকদেরকে প্রকৃতির সরলতা ও মহাবিশ্বের বিশালতার মধ্যে সেতু গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছেন। তিনি উল্লেখ করেন, “আমি চাই মানুষ যখন এই ফিল্ম দেখবে, তখন তারা নিজেদের চারপাশের পরিবেশ ও আকাশের দিকে আরও মনোযোগী হবে, এবং সম্ভবত নিজের জীবনের ছোট ছোট মুহূর্তগুলোকে আরও মূল্য দেবে।”
ওসকারের মনোনয়ন ‘পারফেক্টলি এ স্ট্রেঞ্জনেস’কে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নতুন আলোতে তুলে ধরবে এবং ভবিষ্যতে আরও বেশি চলচ্চিত্র নির্মাতা যেন প্রকৃতি ও বিজ্ঞানকে একত্রিত করে নতুন গল্প বলার প্রেরণা পান।



