গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র নিরাপত্তা পরীক্ষা হিসেবে, ইরান ও রাশিয়া আজ বৃহস্পতিবার সকালে দক্ষিণ ইরানের বন্দর আব্বাসের উপকূলে একটি বাণিজ্যিক জাহাজকে জলদস্যুদের দখলে থেকে মুক্ত করার মক অপারেশন সম্পন্ন করেছে। জাহাজটি জরুরি সংকেত পাঠিয়ে উদ্ধার সমন্বয় কেন্দ্রকে জানায়, ফলে দুই দেশের নৌবাহিনীর দ্রুত সাড়া দেখা যায়। এই অভিযান আঞ্চলিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে উভয় দেশের সামরিক সমন্বয়ের সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে।
বাণিজ্যিক জাহাজের ত্রুটিপূর্ণ সংকেত পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইরানের সেনাবাহিনীর একটি SH-3 হেলিকপ্টার এবং রাশিয়ার IRGC নেভির একটি BEL-412 হেলিকপ্টার তৎক্ষণাৎ এলাকায় পৌঁছায়। হেলিকপ্টারগুলো প্রথম পর্যায়ে জাহাজের অবস্থান নিশ্চিত করে এবং সম্ভাব্য হুমকি সনাক্ত করে, যা পরবর্তী পদক্ষেপের ভিত্তি তৈরি করে।
অপারেশনের কমান্ড শিপ হিসেবে ইরানের আলভান্দ ডেস্ট্রয়ার ব্যবহার করা হয়, যার সঙ্গে নেইজেহ ও খানজার মিসাইল বোটসহ একাধিক আধুনিক নৌযান যুক্ত হয়। রাশিয়া থেকে হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার “ব্রাভি” সমর্থন যোগায়, যা আকাশ থেকে অতিরিক্ত নজরদারি ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া সক্ষমতা প্রদান করে। এই সমন্বিত নৌবাহিনীর গঠন চারপাশের জলের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করে।
সামুদ্রিক ইউনিটগুলো জাহাজের চারপাশে দ্রুত গতি বজায় রেখে ঘেরাও গঠন করে, ফলে জলদস্যুদের পালানোর সুযোগ কমে যায়। সমন্বিত আকাশ-জল আক্রমণের মাধ্যমে জাহাজের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের গ্রেফতার করা হয়। অপারেশনটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হয়ে, জাহাজের ক্রু নিরাপদে রক্ষা পায়।
অভিযানে ইরানের আলভান্দ ডেস্ট্রয়ার, নেইজেহ ও খানজার মিসাইল বোটের পাশাপাশি রাশিয়ার হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার “ব্রাভি” গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উভয় দেশের নৌবাহিনীর মধ্যে ট্যাকটিক্যাল ফর্মেশন অনুশীলন এবং এয়ারিয়াল ফটোগ্রাফি নেওয়া হয়, যা ভবিষ্যৎ সমন্বিত অপারেশনের জন্য ডেটা সংগ্রহে সহায়তা করবে। এই ধরনের যৌথ প্রশিক্ষণ অঞ্চলীয় সাগর নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।
অভিযানের সময় ইরান ও রাশিয়া উভয়ই পারমাণবিক আলোচনা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আলোচনার মাঝখানে রয়েছে। জেনেভায় পরোক্ষভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও, মধ্যপ্রাচ্যের সমুদ্র পথে মার্কিন যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি বাড়ছে। এই দ্বিমুখী চাপের মধ্যে ইরান-রাশিয়া যৌথ নৌমহড়া নিরাপত্তা সংকটের মোকাবেলায় একটি কৌশলগত বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তেহরানের সরকার স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, দেশের সার্বভৌমত্বের কোনো লঙ্ঘন হলে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাবে। একই সঙ্গে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি উল্লেখ করেছেন যে, ভবিষ্যৎ আলোচনার পথ পরিষ্কার করতে উভয় পক্ষের মৌলিক নীতিমালায় সমঝোতা হয়েছে। এই মন্তব্যগুলো আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে ইরানের কূটনৈতিক অবস্থানকে দৃঢ় করে তুলেছে।
অভিযানের ফলাফলকে ইরান ও রাশিয়া উভয়ই সমুদ্র নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতার একটি মাইলফলক হিসেবে তুলে ধরেছে। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন যে, এ ধরনের যৌথ প্রশিক্ষণ আঞ্চলিক শক্তি ভারসাম্যকে প্রভাবিত করতে পারে এবং অন্যান্য দেশের নৌবাহিনীর জন্য সতর্কতা সৃষ্টি করতে পারে। তবে একই সঙ্গে এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ইরান-রাশিয়া সমুদ্র নিরাপত্তা উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতন করে।
আসন্ন সপ্তাহগুলোতে উভয় দেশ এই ধরনের যৌথ অপারেশন চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছে, যাতে সমুদ্র পথে সম্ভাব্য হুমকির মোকাবেলায় দ্রুত প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করা যায়। এছাড়া, পারমাণবিক আলোচনার অগ্রগতি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক উপস্থিতি নিয়ে কূটনৈতিক সংলাপের ফলাফলও এই প্রশিক্ষণের পরবর্তী দিক নির্ধারণ করবে।
সামগ্রিকভাবে, ইরান-রাশিয়া যৌথ নৌমহড়া কেবল একটি প্রশিক্ষণই নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর পরিবর্তনের সূচক হিসেবে কাজ করছে। জাহাজের সফল উদ্ধার এবং জলদস্যুদের গ্রেফতার অঞ্চলীয় সমুদ্র নিরাপত্তা বজায় রাখতে একটি ইতিবাচক উদাহরণ স্থাপন করেছে, যা ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক ও সামরিক কৌশলে প্রভাব ফেলবে।



