ঢাকা, ১৯ ফেব্রুয়ারি – যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের সময় অন্তর্বর্তী সরকার যে অস্থিরতা ও অনিয়ম দেখিয়েছে, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক আনু মুহাম্মদ তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি আজ সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন ওয়াচ’ অনুষ্ঠানে এই বিষয়টি উত্থাপন করেন।
আনু মুহাম্মদ উল্লেখ করেন, চুক্তি স্বাক্ষরের মুহূর্তে সরকার দেশের স্বার্থকে যথাযথভাবে বিবেচনা করেনি এবং নির্বাচিত সরকারের আগমনের অপেক্ষা না করে অস্থায়ীভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার যখন চুক্তিগুলো এভাবে সম্পন্ন করে, তখন বাংলাদেশকে সীমাবদ্ধ অবস্থায় ফেলে দেয়। নির্বাচনের আগে স্বাক্ষর করা কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ দেখা যায় না।”
বক্তা আরও জানান, চুক্তি স্বাক্ষরের সময় সরকারের উত্সাহ অতিরিক্ত ছিল এবং তা বাজেটের সময় থেকে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি যুক্তি দেন, এই অতিরিক্ত উত্সাহের পেছনে লবিস্টের প্রভাব থাকতে পারে, যদিও সরকারকে উপদেষ্টা বা বিশেষ সহকারী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। “চুক্তি করার ক্ষেত্রে তাদের বিশেষ উত্সাহ দেখে মনে হয়, তারা বিভিন্ন কোম্পানির লবিস্টের ভূমিকা পালন করেছে,” তিনি বলেন।
আলোচনায় তিনি স্টারলিংক, একটি মার্কিন ভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী, সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তির প্রভাবের প্রশ্ন তুলেন। আনু মুহাম্মদ উল্লেখ করেন, এই চুক্তি বাংলাদেশের যোগাযোগ অবকাঠামোতে কী পরিবর্তন আনবে তা স্পষ্ট নয় এবং তা দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। তিনি চুক্তির পুনর্বিবেচনা এবং প্রয়োজনীয় হলে পুনরায় আলোচনা করার আহ্বান জানান।
আনু মুহাম্মদ বলেন, “বাজারে নতুন সরকার আসার আগে এই চুক্তিগুলো থেকে মুক্তি পাওয়া এবং দায়িত্বশীলদের জবাবদিহি করা জরুরি।” তিনি যুক্তি দেন, দেশের স্বার্থে চুক্তির শর্তাবলী পুনরায় পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজনে সংশোধন করা উচিত। “যদি এই চুক্তি দেশের স্বার্থের বিরোধী হয়, তবে তা সংশোধন না করা হলে দীর্ঘমেয়াদে বড় অর্থনৈতিক সংকটের সম্ভাবনা থাকে,” তিনি যোগ করেন।
বক্তা উল্লেখ করেন, ৯ ফেব্রুয়ারি, নির্বাচনের কয়েক দিন আগে চুক্তি স্বাক্ষরের কোনো যৌক্তিকতা দেখা যায় না। বিশ্বে অধিকাংশ দেশ এখনও এমন চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি, এবং যারা করেছে, তাদের শর্তাবলীও ভিন্ন। তিনি এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে তুলনা করে বলেন, “বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থায় এই ধরনের চুক্তি স্বাক্ষর করা অযৌক্তিক।”
আলোচনার শেষে আনু মুহাম্মদ দেশের স্বার্থ রক্ষার জন্য একটি জাতীয় পর্যায়ের খোলামেলা আলোচনা আহ্বান করেন। তিনি বলেন, “প্রথম কাজ হলো, এই চুক্তিগুলো থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ পরিষ্কার করা এবং যারা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।” তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, “বাংলাদেশ সরকারকে স্বচ্ছতা বজায় রেখে, ভবিষ্যতে এমন চুক্তি স্বাক্ষরের আগে ব্যাপক পরামর্শ ও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।”
আনু মুহাম্মদের মন্তব্যের পর উপস্থিত কিছু বিশ্লেষক ও নীতিনির্ধারকও এই বিষয়টি নিয়ে মত প্রকাশ করেন। তারা স্বীকার করেন, চুক্তি স্বাক্ষরের সময় রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সময়সীমার চাপের ফলে কিছু ত্রুটি হতে পারে, তবে তা সংশোধনের জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। কিছু বিশ্লেষক যুক্তি দেন, স্টারলিংকের মতো প্রযুক্তি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি দেশের ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে, তবে শর্তাবলী দেশের স্বার্থে হওয়া আবশ্যক।
অন্তর্বর্তী সরকারের এই চুক্তি নিয়ে বিতর্কের মূল বিষয় হল, স্বল্পমেয়াদী রাজনৈতিক সুবিধা ও দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্বার্থের মধ্যে সমতা বজায় রাখা। আনু মুহাম্মদের মতে, দেশের স্বার্থে চুক্তি পুনর্বিবেচনা না করা হলে ভবিষ্যতে আর্থিক ও কূটনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে। তিনি শেষ করে বলেন, “যদি বাংলাদেশ সরকার এই চুক্তিগুলো থেকে মুক্তি পেতে না পারে, তবে তা দেশের উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক অবস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।”
এই আলোচনার পর, বাংলাদেশ সরকারকে চুক্তির শর্তাবলী পুনরায় পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনে সংশোধন করার জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করার প্রস্তাবও উঠে আসে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি, তবে বিষয়টি জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।



