কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলায় ৭ নম্বর ওয়ার্ডের পয়রাডাঙ্গা বাজারে সম্পত্তি ভাগাভাগি নিয়ে পারিবারিক মতবিরোধের ফলে মৃত বাবার দেহ প্রায় এক দিন ধরে আটকে রাখা হয়। ৭৫ বছর বয়সী আজিজার রহমানের মৃত্যু মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ঘটে এবং পরের দিন নির্ধারিত জানাজা ও দাফনের পরিকল্পনা করা হয়। তবে প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রীর সন্তানদের মধ্যে সম্পত্তি ভাগের দাবি নিয়ে বিরোধের কারণে জানাজা সময়মতো অনুষ্ঠিত হতে পারে না।
আজিজার রহমানের সম্পত্তি, যার মধ্যে বাড়ি, জমি ও অন্যান্য সম্পদ অন্তর্ভুক্ত, দ্বিতীয় স্ত্রীর পুত্র রফিকুল ইসলাম (যাকে স্থানীয়ভাবে টাইগার বলা হয়) নামে হস্তান্তর করা হয়েছিল। প্রথম স্ত্রীর পুত্র আবদুল হাকিম এই হস্তান্তরকে চ্যালেঞ্জ করে এবং নিজের অংশের দাবি তুলে ধরে। দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ শেষমেশ আজকের ঘটনার মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বুধবার সকাল প্রায় দশটা পনেরো মিনিটে জানাজা অনুষ্ঠিত করার জন্য স্থানীয় বাসিন্দারা একত্রিত হন, কিন্তু হাকিম সম্পত্তির সমবণ্টন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত দাফনে আপত্তি জানান। তার এই আপত্তি জানাজা স্থগিত করার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দেহটি বাড়ির আঙিনায় কাফন পরানো অবস্থায় একটি খাটে রাখা হয় এবং কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান না হয়ে থাকে।
বিকেল পর্যন্ত স্থানীয় মুরব্বি, গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং কিছু জনপ্রতিনিধি দু’পক্ষকে নিয়ে একাধিক বৈঠক করেন। প্রতিটি বৈঠকে সমাধানের পথ খোঁজার চেষ্টা করা হয়, তবে তৎকালীন কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। বৈঠকগুলোতে উভয় পক্ষের দাবির বৈধতা, জমির শতাংশ এবং আইনগত প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হয়।
সন্ধ্যা দশটার দিকে আবারও একটি সমাধান সভা অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে শেষ পর্যন্ত একটি চূড়ান্ত ভাগাভাগি পরিকল্পনা গৃহীত হয়। বাড়ির মোট ২১ শতাংশ জমির মধ্যে দুই ভাই প্রত্যেকে আট শতাংশ করে পাবেন, অবশিষ্ট অংশ বোনের হক হিসেবে নির্ধারিত হয়। এছাড়া আবাদি জমি আইনানুগ তদারকি ও ন্যায়সঙ্গত বণ্টনের জন্য আলাদা ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
উভয় পক্ষের সম্মতিতে স্ট্যাম্পে লিখিত অঙ্গীকারনামা প্রস্তুত করা হয় এবং দুজনই এতে স্বাক্ষর করেন। এই লিখিত চুক্তি ভবিষ্যতে কোনো বিরোধ এড়াতে আইনি ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে বলে প্রত্যাশা করা হয়। চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর রাত একটার দিকে জানাজা পুনরায় অনুষ্ঠিত হয়।
দেহটি পারিবারিক কবরস্থানে নিয়ে গিয়ে শেষবারের মতো ধর্মীয় আচার সম্পন্ন করা হয়। দাফন কাজের সময় উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা, মুরব্বি এবং কয়েকজন রাজনৈতিক প্রতিনিধি। দেহের শেষ বিশ্রাম স্থলটি পরিবারিক সম্পত্তির মধ্যে অবস্থিত, যা আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল।
দাফনের দেরি নিয়ে এলাকার মানুষদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কিছু লোক দেরি হওয়ায় শোক ও রাগ প্রকাশ করে, আবার অন্যরা সমাধানের জন্য করা প্রচেষ্টাকে স্বীকৃতি দেয়। স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমানের মতে, সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধের সমাধান পারিবারিক আদালতের মাধ্যমে করা উচিত ছিল। তিনি উল্লেখ করেন, মৃতের দেহকে ত্রিশ ঘণ্টা পর্যন্ত ফেলে রাখা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে অগ্রহণযোগ্য।
মিজানুরের পাশাপাশি অন্যান্য কিছু বাসিন্দা জানান, মৃতের সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কাছ থেকে কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। এই পরিস্থিতি স্থানীয় প্রশাসনের দৃষ্টিতে একটি সামাজিক উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, সম্পত্তি বিরোধের ক্ষেত্রে পারিবারিক আদালত সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ। আদালতের হস্তক্ষেপে সম্পত্তি ভাগের ন্যায্যতা নিশ্চিত করা যায় এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনা রোধ করা সম্ভব।
এই ঘটনার পরবর্তী পর্যায়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এবং মুরব্বিরা বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন। কোনো নতুন বিরোধ উদ্ভব হলে তা দ্রুত সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শেষ পর্যন্ত, আজিজার রহমানের পরিবার এই দুঃখজনক ঘটনার পর শান্তি ও সমঝোতার পথে অগ্রসর হওয়ার আশাবাদ প্রকাশ করেছে।



