কুমিল্লা জেলার মনোহরগঞ্জ উপজেলায় মোট ৯৮টি সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মিত হয়নি। এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভাষা শহীদদের স্মরণে স্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভের অভাব রয়েছে, ফলে ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের আনুষ্ঠানিকতা সীমিত থাকে। সম্প্রতি এই ঘাটতি স্থানীয় প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
অনেক স্কুল ও কলেজে এই দিনটি উদযাপন করতে কলা গাছ ও বাঁশের অস্থায়ী কাঠামো ব্যবহার করা হয়, যা সাধারণত একদিনের জন্য সাজানো হয়। তবে কোনো স্থায়ী শহীদ মিনার না থাকায় শিক্ষার্থীদের জন্য ঐতিহাসিক গুরুত্ব প্রকাশে বাধা সৃষ্টি হয়। অস্থায়ী কাঠামোতে ছবি ও শিলালিপি যুক্ত করা হলেও তা দীর্ঘমেয়াদী স্মরণে কমফল।
উপজেলা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ১০৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৮১টিতে শহীদ মিনার নেই। অবশিষ্ট ২৩টি বিদ্যালয়ে এই স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা হয়েছে, যার মধ্যে মনোহরগঞ্জ দারুল উলুম কেরামতিয়া ফাজিল মাদ্রাসা অন্যতম। প্রাথমিক স্তরে শহীদ মিনার না থাকলে শিক্ষার্থীরা ভাষা আন্দোলনের মূল ঘটনা পাঠ্যবইয়ের সীমাবদ্ধতায় থাকে।
মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ এবং মাদ্রাসা সহ মোট ৪৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৭টিতে শহীদ মিনার অনুপস্থিত। এই সংখ্যা উচ্চশিক্ষা স্তরে প্রায় এক তৃতীয়াংশ প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করে, যেখানে শিক্ষার্থীরা জাতীয় গর্বের প্রতীক হিসেবে শহীদ মিনারকে ব্যবহার করে। অনুপস্থিতি শিক্ষার্থীদের ঐতিহাসিক সচেতনতা গড়ে তোলার সুযোগকে সীমিত করে।
সর্বমোট ৯৮টি প্রতিষ্ঠান এখনো শহীদ মিনার নির্মাণের অপেক্ষায় রয়েছে, যা পুরো উপজেলায় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসকে পাঠ্যবইয়ের সীমাবদ্ধ রাখে। শিক্ষার্থীরা তাত্ত্বিক জ্ঞান পায়, তবে বাস্তবিক স্মরণ ও সম্মান জানাতে যথাযথ স্থান না থাকায় শিক্ষার মান কমে যায়। এই ঘাটতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয়ের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে।
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা কাজী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর উল্লেখ করেন, শহীদ মিনার স্থাপন শিক্ষার্থীদের ভাষা আন্দোলনের তাত্পর্য বুঝতে সহায়তা করবে এবং জাতীয় গর্বের অনুভূতি জাগ্রত করবে। তিনি বলেন, শহীদ মিনার না থাকলে ২১শে ফেব্রুয়ারি দিবসের আনুষ্ঠানিকতা ও শিক্ষামূলক কার্যক্রম দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই তিনি দ্রুত নির্মাণ কাজ শুরু করার আহ্বান জানান।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গাজালা পারভীন রুহি জানান, শহীদ মিনার অনুপস্থিতি সম্পর্কে তিনি পূর্বে অবগত ছিলেন না এবং দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি উল্লেখ করেন, বাজেট অনুমোদন ও নির্মাণ পরিকল্পনা শীঘ্রই চূড়ান্ত করা হবে। এ ধরনের পদক্ষেপের মাধ্যমে আগামী বছর থেকে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন সম্ভব হবে।
শহীদ মিনার কেবল একটি কাঠামো নয়, এটি ভাষা আন্দোলনের শিকারদের প্রতি সম্মানসূচক এবং শিক্ষার্থীদের জাতীয় পরিচয় গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। স্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে সংযুক্ত করা সম্ভব, যা তাদের আত্মগৌরব ও সামাজিক দায়িত্ববোধ বাড়ায়।
শহীদ মিনার না থাকলে শিক্ষকদের পাঠ পরিকল্পনায় ঐতিহাসিক ঘটনার বাস্তবিক উদাহরণ যোগ করা কঠিন হয়; ফলে শিক্ষার্থীরা কেবল বইয়ের পৃষ্ঠায় সীমাবদ্ধ থাকে। এই ঘাটতি দূর করতে দ্রুত নির্মাণ কাজ শুরু করা জরুরি, পাশাপাশি স্থানীয় সমাজ ও এনজিওদের সহযোগিতা চাওয়া উচিত।
আপনার এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার আছে কি? যদি না থাকে, তবে স্থানীয় প্রশাসন ও শিক্ষাবিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করে এই গুরুত্বপূর্ণ স্মারক স্থাপনের জন্য উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। একসাথে কাজ করলে ২১শে ফেব্রুয়ারি দিবসের মর্যাদা ও শিক্ষার গুণগত মান উভয়ই উন্নত হবে।



