বুধবার রাত প্রায় ১০টায় জাতির উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর ত্রিপুরা ভাষণে আইনের শাসনকে রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ নীতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ত্রিপুরা উল্লেখ করেন, দলীয় বা রাজনৈতিক প্রভাব, জবরদস্তি নয়, বরং আইনের ভিত্তিতে শাসন চালানোই দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার মূল চাবিকাঠি। তিনি বলেন, স্বাধীনতাপ্রিয় গণতন্ত্রের পক্ষে জনগণের অধিকার ও মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুযোগ এখন আবার সৃষ্টি হয়েছে।
বক্তব্যে ত্রিপুরা সকল ধর্ম ও সম্প্রদায়ের নাগরিককে সমানভাবে নিরাপদ ও সমৃদ্ধ দেশ গড়ার আহ্বান জানান। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান কিংবা যেকোনো ধর্মের মানুষ, পাহাড়ে হোক বা সমতলে, এই দেশ তাদেরই। তিনি জোর দিয়ে বলেন, প্রতিটি নাগরিকের জন্য বাংলাদেশকে নিরাপদ ভূমিতে রূপান্তর করা সরকারের অগ্রাধিকার। ত্রিপুরা আরও উল্লেখ করেন, “একটি স্বনির্ভর নিরাপদ মানবিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাই বিএনপি সরকারের লক্ষ্য” বলে, যা বর্তমান শাসনের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে তুলনা করে একটি রাজনৈতিক পার্থক্য তুলে ধরে।
প্রধানমন্ত্রী ত্রিপুরা ফ্যাসিবাদী শাসনকালের দুর্নীতি, ভঙ্গুর অর্থনীতি ও দুর্বল শাসন কাঠামোর পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান সরকারের কাজের ভিত্তি ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, নতুন সরকার দুর্নীতি দমন, আইনশৃঙ্খলা পুনঃস্থাপন ও জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। ত্রিপুরা উল্লেখ করেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জুয়া ও মাদকের বিস্তার আইনশৃঙ্খলার অবনতির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে এবং এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী কঠোরভাবে হস্তক্ষেপ করছে।
সরকারের দৃষ্টিতে জনজীবনে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সকল সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে বিধিবদ্ধ নীতি ও নিয়মের অধীনে পরিচালনা করা হবে। ত্রিপুরা জোর দিয়ে বলেন, দলীয় বা রাজনৈতিক প্রভাবের বদলে আইনের শাসনই রাষ্ট্র পরিচালনার শেষ কথা হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগণের মধ্যে শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।
বিপক্ষের দলগুলো ত্রিপুরার এই বক্তব্যকে রাজনৈতিক রণকৌশল হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। বিএনপি নেতারা দাবি করেন, সরকার আইনের শাসনকে দাবি করলেও বাস্তবে দুর্নীতি ও আইনশৃঙ্খলার অবনতি অব্যাহত রয়েছে। তারা ত্রিপুরার মন্তব্যে উল্লেখিত “বিএনপি সরকারের লক্ষ্য” কথাটিকে রাজনৈতিক ব্যঙ্গ হিসেবে তুলে ধরেছে এবং সরকারকে বাস্তবায়নে ত্বরান্বিত পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলেন, ত্রিপুরার এই ভাষণ আসন্ন নির্বাচনের পূর্বে সরকারকে আইনি শাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের আস্থা জোগানোর একটি কৌশল হতে পারে। তারা পূর্বাভাস দেন, যদি সরকার সত্যিকারের আইনের শাসন নিশ্চিত করতে পারে, তবে তা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের আক্রমণকে কমাতে সহায়তা করবে। অন্যদিকে, যদি বাস্তবায়নে ঘাটতি থাকে, তবে বিরোধী দলগুলো তা ব্যবহার করে সরকারের দুর্বলতা তুলে ধরবে।
প্রধানমন্ত্রীর ত্রিপুরা ভাষণে উল্লেখিত নীতি ও পরিকল্পনা আগামী মাসে বিভিন্ন স্তরে বাস্তবায়ন শুরু হবে বলে জানানো হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা সংস্থাগুলো জুয়া ও মাদক সংক্রান্ত অপারেশন বাড়াবে, আর দুর্নীতি বিরোধী কমিশনকে স্বতন্ত্রভাবে কাজ করার অনুমোদন দেওয়া হবে। ত্রিপুরা উল্লেখ করেন, এই পদক্ষেপগুলো দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক সুনাম বাড়াতে সহায়তা করবে।
সারসংক্ষেপে, প্রধানমন্ত্রীর ত্রিপুরা ভাষণ আইনের শাসনকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল নীতি হিসেবে তুলে ধরেছে এবং সরকারকে ধর্মনিরপেক্ষ, নিরাপদ ও স্বনির্ভর গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে অগ্রসর হতে আহ্বান জানিয়েছে। এই ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার, বিরোধী দল ও বিশ্লেষকরা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ ও নীতি বাস্তবায়নের দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন।



