আঙ্কারা তুরস্কের পারমাণবিক ক্ষমতা অর্জনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা বন্ধ করে না; প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান সাম্প্রতিক সময়ে এই বিষয়কে কূটনৈতিক অগ্রাধিকারে তুলে ধরেছেন। গাজা যুদ্ধের পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিবেশে উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ায় তুরস্কের কৌশলগত অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
এরদোয়ান দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্যের একচেটিয়া ক্ষমতাকে ‘কাঠামোগতভাবে অন্যায়’ বলে সমালোচনা করছেন। তিনি ‘বিশ্ব পাঁচের চেয়েও বড়’ স্লোগান ব্যবহার করে পারমাণবিক বৈষম্যের দিকে ইঙ্গিত দেন, যেখানে কিছু দেশকে অযৌক্তিকভাবে সুবিধা দেওয়া হয়।
আঙ্কারার মতে, ইসরাইলের অঘোষিত পারমাণবিক ভাণ্ডারকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এড়িয়ে চললেও, অন্যান্য দেশগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি আরোপ করা দ্বিমুখী নীতি হিসেবে কাজ করে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তুরস্ক পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্রের দিকে অগ্রসর হলে সমান নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে বলে দাবি করা হচ্ছে।
২০২৩ সালে গাজা যুদ্ধের পর থেকে এরদোয়ান এই বৈষম্যকে আরও জোরালোভাবে প্রকাশ করেছেন, যেখানে তিনি ইসরাইলের পারমাণবিক অবস্থানকে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তুরস্কের নেতৃত্ব এই মুহূর্তে পারমাণবিক ক্ষমতা অর্জনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে, যাতে আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকি কমে।
ইরান যদি শেষ পর্যন্ত পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্রে পরিণত হয়, তবে তুরস্কের কূটনৈতিক অবস্থান কঠিন হয়ে পড়বে বলে আঙ্কারা সতর্কতা জানিয়েছে। তুরস্কের লক্ষ্য একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা কাঠামো গঠন, যেখানে পারমাণবিক সক্ষমতা চূড়ান্ত প্রতিরোধের হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রক্রিয়া তুরস্কের জন্য সহজ নয়। রাশিয়া সহযোগিতায় আক্কুয়ু পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মাধ্যমে তুরস্ক প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও দক্ষ কর্মী অর্জন করছে, তবে রাজনৈতিক ও আইনি বাধা এখনও বিদ্যমান।
তুরস্ক বর্তমানে পারমাণবিক অস্ত্র অ-প্রসার চুক্তি (এনপিটি) স্বাক্ষরকারী দেশ, যা অস্ত্র কর্মসূচি শুরু করলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। এই ঝুঁকি বিবেচনা করে তুর্কি সরকার সরাসরি বোমা উৎপাদনের বদলে ‘নিউক্লিয়ার লেটেন্ট’ কৌশল গ্রহণের সম্ভাবনা দেখাচ্ছে।
‘নিউক্লিয়ার লেটেন্ট’ কৌশল মানে হল পারমাণবিক প্রযুক্তি ও সক্ষমতা হাতে রাখা, যাতে প্রয়োজনের মুহূর্তে দ্রুত অস্ত্র উৎপাদন করা যায়। এই পদ্ধতি তুরস্ককে আন্তর্জাতিক নজরদারি থেকে কিছুটা রক্ষা করবে এবং কূটনৈতিক দরকষাকষিতে সুবিধা দেবে।
আঞ্চলিক পর্যায়ে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মতো দেশগুলোর সঙ্গে তুরস্কের পারমাণবিক সহযোগিতা ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বাড়ছে। এই দেশগুলোও পারমাণবিক ক্ষমতা বা তার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, যা তুরস্কের কৌশলগত অবস্থানকে আরও জটিল করে তুলছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা তুরস্কের ভবিষ্যৎ পদক্ষেপের দিকে নজর রাখছে; যদি তুরস্ক এনপিটি লঙ্ঘন করে বা পারমাণবিক অস্ত্রের স্পষ্ট সংকেত দেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়ন হতে পারে। তুরস্কের কূটনৈতিক দল বর্তমানে এই বিষয়টি কূটনৈতিক চ্যানেল ও দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করার চেষ্টা করছে।



