লন্ডনে বসবাসকারী চার্লট নামের এক তরুণী শৈশবের শেষের দিকে নিজের চেহারার প্রতি তীব্র অস্বীকৃতি অনুভব করেন, যা তার দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে। তার সমস্যার মূল কারণ বডি ডাইসফরমিক ডিসঅর্ডার (BDD) নামে পরিচিত একটি মানসিক অবস্থা, যা পরে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের দ্বারা নিশ্চিত হয়।
চার্লট প্রায় প্রতিদিন সকাল পাঁচটায় জাগে এবং স্কুলের বাসের সময়ের আগে পর্যন্ত মেকআপ করতে থাকে। তিনি একাধিকবার মেকআপ সরিয়ে আবার লাগাতেন, যাতে প্রতিটি দিক সমমিত ও নিখুঁত হয়। এই রুটিনটি তার জন্য একধরনের বাধ্যতামূলক আচরণে পরিণত হয়।
এই অতিরিক্ত যত্নের ফলে তিনি ধীরে ধীরে সামাজিক যোগাযোগ থেকে দূরে সরে যান। কলেজে ভর্তি হওয়ার পরও তিনি কেবল পরীক্ষার জন্যই ক্যাম্পাসে যান, অন্য কোনো কার্যকলাপে অংশ নিতে পারেন না। প্রমের রাতে তিনি উপস্থিত হতে পারেননি, কারণ ক্যামেরায় তার ছবি তোলার ধারণা তাকে অস্বস্তিকর করে তুলেছিল।
পরবর্তীতে মানসিক স্বাস্থ্য সেবার মাধ্যমে তাকে BDD নির্ণয় করা হয়। বডি ডাইসফরমিক ডিসঅর্ডার এমন একটি অবস্থা যেখানে নিজের শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগ দৈনন্দিন কাজকর্মে বাধা সৃষ্টি করে। এই রোগের ক্ষেত্রে অন্যরা স্বাভাবিক মনে করা দিকগুলো রোগীর কাছে সম্পূর্ণ ভুল বলে মনে হয়।
বিবিসি’র একটি জটিল পডকাস্টে অ্যানগ্লিয়া রাসকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ভিরেন স্বামী BDD সম্পর্কে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি তার দেহের কোনো এক অংশের প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগ দেয়, যা তার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
BDD-র প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে আত্মসমালোচনা, চেহারার বিষয়ে নিয়ন্ত্রণহীন চিন্তা, এবং আবেগগত অশান্তি। রোগীরা প্রায়ই আয়না বারবার পরীক্ষা করেন বা সমস্যাযুক্ত অংশটি স্পর্শ করে নিশ্চিত করার চেষ্টা করেন। স্বামী উল্লেখ করেন, এই ধরনের পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ রোগীর জীবনের অন্যান্য দিককে ধীরে ধীরে অদৃশ্য করে দেয়।
যদিও ঐতিহাসিকভাবে নারীদের মধ্যে দেহের অসন্তোষ বেশি দেখা যায়, BDD-তে লিঙ্গভেদ স্পষ্ট নয়; পুরুষ ও নারী উভয়েই সমানভাবে আক্রান্ত হতে পারেন। তাই রোগের সনাক্তকরণে লিঙ্গকে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
চার্লট প্রথমে স্থানীয় মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবার অধীনে থেরাপি শুরু করেন, এরপর লন্ডনের একটি উদ্বেগজনিত রোগের রেসিডেন্সিয়াল ইউনিটে ভর্তি হন। সেখানে তিনি পেশাগত থেরাপি, শিল্পকলা এবং সঙ্গীতের মাধ্যমে নিজের অভ্যন্তরীণ চাপ মোকাবিলা করতে শিখেন।
বিশেষ করে মাটির পাত্র তৈরি, চিত্রাঙ্কন এবং গানের রচনা তার জন্য স্বস্তির উৎস হয়ে ওঠে। এই সৃজনশীল কার্যকলাপগুলো তার পারফেকশনিজমকে ইতিবাচক দিকের দিকে মোড়াতে সাহায্য করে এবং অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা আবেগকে প্রকাশের সুযোগ দেয়।
এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তিনি আবার সঙ্গীতের সঙ্গে যুক্ত হন, যা তার আত্মবিশ্বাস পুনর্গঠন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শিল্পকর্ম ও সঙ্গীতের সাহায্যে তিনি নিজের চেহারার প্রতি অতিরিক্ত উদ্বেগকে ধীরে ধীরে কমাতে সক্ষম হন এবং জীবনের অন্যান্য দিকগুলোতে মনোযোগ দিতে পারেন।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, BDD-র মতো মানসিক রোগের ক্ষেত্রে সময়মতো সনাক্তকরণ ও উপযুক্ত থেরাপি অত্যন্ত জরুরি। রোগীর আত্মমর্যাদা পুনর্গঠনের জন্য শিল্প থেরাপি, সঙ্গীত থেরাপি এবং পেশাগত থেরাপি সহ বিভিন্ন পদ্ধতি কার্যকর হতে পারে।
আপনার বা আপনার পরিচিত কারো মধ্যে যদি চেহারার প্রতি অতিরিক্ত উদ্বেগ, বারবার আয়না পরীক্ষা করা বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতার লক্ষণ দেখা যায়, তবে দ্রুত মানসিক স্বাস্থ্য সেবার সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। সময়মতো সহায়তা গ্রহণ করলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা সম্ভব।



