লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলায় টেস্তা নদীর তীরে অবস্থিত বারঘোরিয়া গ্রামে দুইজন বয়স্ক চাষী সম্প্রতি তাদের দৈনন্দিন কষ্টের কথা শেয়ার করেছেন। ৬৫ বছর বয়সী রফিজ উদ্দিন এবং ৬০ বছর বয়সী আজিজুল ইসলাম উভয়েই স্থানীয় আমপুরিয়া ভাষায় কথা বলেন, যা রঙপুরের নিজস্ব উপভাষা হিসেবে পরিচিত। তাদের কথোপকথন থেকে স্পষ্ট হয় যে শীতের তীব্রতা ও আর্থিক সংকটের কারণে কৃষিকাজ কঠিন হয়ে পড়েছে, পাশাপাশি এই ভাষা ধীরে ধীরে নিঃশব্দ হয়ে যাচ্ছে।
রফিজ উদ্দিন জানান, তার ধানক্ষেতের তামাকের গাছ শীতের তাপে শুকিয়ে গিয়েছে এবং তার পুরনো শার্টও ফাটিয়ে পড়েছে, নতুন কিছু কিনতে তার কাছে তহবিল নেই। একই সময়ে আজিজুল ইসলাম বলেন, শীতের কারণে তার কাজের পরিমাণ বেড়েছে, সন্তানরা তার কথা শোনে না, এবং তাকে ভোরবেলা মাঠে গিয়ে ধানকাটা ও গবাদি পশু পালনের কাজ করতে হয়। উভয়ই তাদের সমস্যার মূল কারণ হিসেবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও আর্থিক অক্ষমতা উল্লেখ করেছেন।
এই দুই চাষীর কথোপকথন কেবল কৃষিকাজের কষ্টই নয়, বরং একটি ভাষাগত সংকটের দিকও উন্মোচন করে। আমপুরিয়া ভাষা, যা স্থানীয় মানুষদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার হয়, এখন ৫০ বছরের উপরে বয়সী গ্রামবাসীদের মধ্যে বেশি শোনা যায়, তবে তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে এর ব্যবহার কমে যাচ্ছে। বাড়ির ভেতরে, বিশেষ করে সন্তানদের সঙ্গে কথা বলার সময়, অধিকাংশই স্ট্যান্ডার্ড বাংলা ব্যবহার করে, ফলে আমপুরিয়া ধীরে ধীরে ভুলে যাওয়ার পথে।
ভাষাটির স্বতন্ত্রতা স্পষ্ট করতে কিছু শব্দের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, “আঙ্গা” শব্দটি বাংলায় জামা অর্থে ব্যবহৃত হয়, “মুচিপদ” মানে বিপদ, “চোয়া” মানে সন্তান, আর “নিন” শব্দটি ঘুমের সমতুল্য। এই শব্দগুলো গ্রাম্য তরুণদের কাছে অচেনা, যা ভাষাগত ফাঁক বাড়িয়ে দিচ্ছে। রফিজের ৪০ বছর বয়সী পুত্র বেলাল হোসেন, যিনি নিজেও চাষি, আমপুরিয়া ভাষায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন না, তবে স্ট্যান্ডার্ড বাংলায় তিনি স্বচ্ছভাবে উত্তর দেন। এই ঘটনা ভাষার ব্যবহারিক দূরত্বকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে।
স্থানীয় সমাজে দেখা যায়, ৫০ বছরের বেশি বয়সী মানুষ যখন একত্রিত হয়, তখন আমপুরিয়া ভাষা এখনও জীবন্ত থাকে, তবে বাড়ির ভিতরে এবং শিক্ষার পরিবেশে বাংলা প্রাধান্য পায়। ফলে, তরুণ প্রজন্মের ভাষা শিখতে আগ্রহ কমে যায় এবং তারা শহুরে সংস্কৃতির সঙ্গে বেশি পরিচিত হয়। এই প্রবণতা ভবিষ্যতে ভাষাটির সম্পূর্ণ বিলুপ্তির দিকে নিয়ে যেতে পারে, যদি না কোনো সংরক্ষণমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, ভাষা হল একটি সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মূল অংশ, এবং এর ক্ষয় মানে ঐতিহ্যগত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার হার। আমপুরিয়া ভাষা যদি হারিয়ে যায়, তবে স্থানীয় কৃষি পদ্ধতি, ঐতিহ্যবাহী গানের লিরিক্স এবং গ্রাম্য জীবনের বহু দিকের নথিভুক্তি ম্লান হয়ে যাবে। তাই, ভাষা সংরক্ষণে স্থানীয় বিদ্যালয়, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সরকারী সংস্থার সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
এই পরিস্থিতি স্থানীয় প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, এবং কিছু উদ্যোগের কথা শোনা যাচ্ছে, যেমন গ্রাম্য বিদ্যালয়ে আমপুরিয়া ভাষার মৌলিক পাঠ্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করা এবং স্থানীয় মিডিয়ায় ভাষাটিকে প্রচার করা। তবে বাস্তবায়নের জন্য আর্থিক সহায়তা ও সচেতনতা বৃদ্ধি অপরিহার্য।
সংক্ষেপে, বারঘোরিয়া গ্রামে শীতের কঠিন পরিস্থিতি, আর্থিক সংকট এবং ভাষাগত পরিবর্তন একসাথে দেখা যাচ্ছে। দুইজন বৃদ্ধ চাষীর কথায় স্পষ্ট হয় যে, কৃষিকাজের কষ্টের পাশাপাশি তাদের মাতৃভাষা আমপুরিয়া ধীরে ধীরে নিঃশব্দ হয়ে যাচ্ছে। তরুণ প্রজন্মের ভাষা ব্যবহার হ্রাস এবং স্ট্যান্ডার্ড বাংলার আধিপত্য এই প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করছে। ভাষা সংরক্ষণে ত্বরিত পদক্ষেপ না নিলে, এই অনন্য উপভাষা ভবিষ্যতে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে।



