ঢাকা, ১৮ ফেব্রুয়ারি – ১১ টায় কারওয়ান বাজারে প্রথম আলোয়ের আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনের সামনে একটি বিশেষ শিল্পপ্রদর্শনী ‘আলো’ উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে দেশের প্রধান সংবাদপত্রের মালিক, সম্পাদক, সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ এবং গণমাধ্যমের কর্মীরা অংশ নেন, যারা স্বাধীন সাংবাদিকতা ও গণতন্ত্রের সংহতি জোরদার করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
প্রদর্শনীর মূল সৃষ্টিকর্তা শিল্পী মাহ্বুবুর রহমান, যিনি ধ্বংসাবশেষের মধ্যে নতুন প্রাণের উদ্ভবকে চিত্রিত করতে চেয়েছেন। তার কাজগুলো ভবনের ভাঙা শাটার ও কাচের দরজার পাশে স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে আগুনের ছাপ ও ধোঁয়ার চিহ্ন স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
প্রদর্শনীটি ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে এবং প্রতিদিন দু’টি সময়সীমায় দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে: সকাল ১১টা থেকে ১টা এবং বিকেল ৩টা থেকে ৫টা। এই সময়ে সাধারণ জনগণ ও মিডিয়া কর্মীরা ভবনের ধ্বংসাবশেষের মধ্য দিয়ে শিল্পের মাধ্যমে পুনর্গঠন ও পুনর্জাগরণের বার্তা গ্রহণ করতে পারবেন।
প্রথম আলোয়ের নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করে উপস্থিতদের স্বাগত জানিয়ে বলেন, “আজকের এই সমাবেশ কেবল ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবন দেখার নয়, বরং ভয়ঙ্কর হামলার পরেও স্বাধীন চেতনা রক্ষা করার সংকল্প প্রকাশের একটি মঞ্চ।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, “এই প্রদর্শনী আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেবে যে, কোনো আক্রমণ আমাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে দমিয়ে রাখতে পারবে না।”
মাহ্বুবুর রহমানের মন্তব্যে তিনি জানান, “আমি ধ্বংসের স্তূপের মধ্যে নতুন শক্তি ও আশার আলো ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছি। দগ্ধ ভবনের প্রতিটি ধ্বংসাবশেষে একটি নতুন সৃষ্টির সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে।” তার কথায় শিল্পের মাধ্যমে পুনর্গঠন ও পুনর্জন্মের ধারণা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
গত বছর ১৮ ডিসেম্বর রাত ১১ টার দিকে একদল উগ্রবাদী গোষ্ঠী প্রথম আলো কার্যালয়ে প্রবেশ করে, শাটার ও বড় কাচের দরজা ভেঙে ফেলে, লুটপাট চালায় এবং আগুন জ্বালিয়ে দেয়। একই রাতে তারা দ্য ডেইলি স্টার ভবনেও অনুরূপ ধ্বংস ও অগ্নিসংযোগ করে। ফলে প্রথম আলোয়ের অনলাইন সংবাদ সেবা এক রাতের জন্য বন্ধ হয়ে যায় এবং ১৯ ডিসেম্বরের ছাপা সংস্করণও প্রকাশিত হয় না – ২৬ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো। তবে ১৭ ঘণ্টার মধ্যে অনলাইন কার্যক্রম পুনরায় চালু হয় এবং ২০ ডিসেম্বরের সকালে ছাপা পত্রিকা পুনরায় প্রকাশিত হয়।
এই ঘটনাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে সাংবাদিক সম্প্রদায়ের মধ্যে সংহতির আহ্বান বাড়ে। বহু মিডিয়া সংস্থা ও সাংবাদিক ইউনিয়ন এই হামলাকে গণতন্ত্রের ওপর আক্রমণ হিসেবে চিহ্নিত করে, এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নতি, আইনি পদক্ষেপের ত্বরান্বিত বাস্তবায়ন এবং দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানায়।
অধিকন্তু, সরকারী কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের পুনর্নির্মাণে সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে বিরোধী দলগুলোরও এই ঘটনার রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে মন্তব্য রয়েছে; তারা মিডিয়া স্বাধীনতার সুরক্ষায় আইন প্রয়োগের ত্বরান্বিততা এবং সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের দাবি তুলে ধরছে।
‘আলো’ প্রদর্শনী কেবল শিল্পকর্মের সমাবেশ নয়, বরং ধ্বংসের পর পুনর্গঠনের প্রতীক হিসেবে কাজ করছে। এটি সাংবাদিকদের মধ্যে ঐক্যের বার্তা বহন করে, যা ভবিষ্যতে মিডিয়া নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা সংরক্ষণের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে মিডিয়া কর্মীরা একসাথে দাঁড়িয়ে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর রক্ষায় নতুন শক্তি সঞ্চার করার প্রত্যাশা প্রকাশ করেছে।
প্রদর্শনী চলাকালীন সময়ে দর্শক ও মিডিয়া কর্মীরা শিল্পকর্মের মাধ্যমে ধ্বংসের স্মৃতি ও পুনর্জন্মের আশা একসাথে অনুভব করতে পারছেন, যা দেশের সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎকে আরও দৃঢ় ও স্বচ্ছ করার লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।



