চিলির পরিচালক, প্রযোজক ও চিত্রনাট্যকার হুয়ান পাব্লো সাল্লাটো তার প্রথম কল্পনাপ্রসূত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘দ্য রেড হ্যাঙ্গার’কে বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে উপস্থাপন করেছেন। চলচ্চিত্রটি ১৯৭০‑এর চিলিতে সামরিক অভ্যুত্থানের সময়কালে ঘটতে থাকা নৈতিক দ্বন্দ্ব ও মানবিক সংগ্রামকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। বার্লিনের পার্সপেকটিভস সেকশনে বিশ্বপ্রদর্শনী হওয়ায় এটি আন্তর্জাতিক দর্শকের নজরে প্রথমবারের মতো এসেছে।
চলচ্চিত্রের কাহিনী ক্যাপ্টেন জর্জে সিলভার ওপর ভিত্তি করে, যিনি একসময় চিলি বিমানবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান ছিলেন। অভ্যুত্থানের পর, তাকে একটি অপ্রত্যাশিত আদেশ দেওয়া হয়: বিমানবাহিনীর একাডেমি, যেখানে তিনি তরুণ ক্যাডেটদের প্রশিক্ষণ দিতেন, সেটিকে আটক ও নির্যাতনের কেন্দ্রস্থলে রূপান্তর করতে হবে। এই আদেশটি চিলির সামরিক জেনারেল অগুস্তো পিনোচেতের নেতৃত্বে গৃহীত অভ্যুত্থানের পরপরই আসে, যা সমাজতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট স্যালভাদর আলেন্ডের শাসনকে উখাদে দেয়।
সিলভা চরিত্রটি নিজের নৈতিকতার সঙ্গে সংগ্রাম করে, কারণ তিনি বিশ্বাস করেন যে এই ভয়াবহতা স্বল্পস্থায়ী হবে এবং তিনি নিজেকে ঘটনাবলির বাইরে রাখার চেষ্টা করেন। তবে, একদিন তার পুরনো প্রতিদ্বন্দ্বী, কর্নেল জাহ্নের উপস্থিতি সবকিছু বদলে দেয়। জাহ্নের ফিরে আসা সিলভাকে অতীতের স্মৃতি ও দায়িত্বের মুখোমুখি করে, যা তাকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।
সাল্লাটো এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ১৯৭০‑এর চিলি সামরিক শাসনের গোপন কক্ষগুলোকে উন্মোচিত করতে চেয়েছেন। তিনি পূর্বে ‘রেড আইস’, ‘অ্যাডিক্টেড টু দ্য হর্ন’, ‘ফ্রিড’ এবং ‘দ্য কালচার অফ সেক্স’ নামের ডকুমেন্টারি ও সিরিজ পরিচালনা করেছেন, যা সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়কে সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করেছে। ‘দ্য রেড হ্যাঙ্গার’ তার সৃজনশীল যাত্রার নতুন মাইলফলক, যেখানে তিনি কাল্পনিক বর্ণনা ও বাস্তব ঘটনার মিশ্রণ ঘটিয়ে একটি থ্রিলার রূপে উপস্থাপন করেছেন।
চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লুইস এমিলিও গুজমানের লেখা, এবং এতে নিকোলাস জারাতে, বোরিস কোয়ার্সিয়া, মার্সিয়াল টাগলে, ক্যাটালিনা স্টুয়ার্ডো ও আরন হের্নান্দেজের মতো চিলিয়ান অভিনেতারা অভিনয় করেছেন। নিকোলাস জারাতে পূর্বে ‘প্রিজন ইন দ্য অ্যান্ডিজ’ ও ‘ইনসাইড দ্য মাইন্ড অফ এ সাইকোপ্যাথ’ ছবিতে কাজ করেছেন, যা তার অভিনয় দক্ষতাকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে।
প্রযোজনা কাজটি ভিলানো প্রোডাকশন প্রধানত পরিচালনা করেছে, আর ব্রাভা সাইন, রেইন ডগস, ক্যারাভান, বার্তা ফিল্ম ও টিভিএনসহ বেশ কয়েকটি চিলিয়ান ও আন্তর্জাতিক সংস্থা সহ-প্রযোজক হিসেবে যুক্ত হয়েছে। বিশ্ববিক্রয়ের দায়িত্ব পেয়েছে প্রিমিয়াম ফিল্মস/এমপিএম প্রিমিয়াম, যা চলচ্চিত্রকে বিভিন্ন বাজারে পৌঁছানোর পরিকল্পনা করেছে।
‘দ্য রেড হ্যাঙ্গার’ সম্পূর্ণ কালো-সাদা রঙে শুট করা হয়েছে, যা ১৯৭০‑এর চিলি সামরিক শাসনের কঠোর ও গাঢ় পরিবেশকে দৃশ্যমানভাবে প্রকাশ করে। চলচ্চিত্রটি সত্যিকারের ঘটনার উপর ভিত্তি করে তৈরি, যদিও চরিত্র ও কিছু ঘটনার কাল্পনিক রূপান্তর রয়েছে। এই পদ্ধতি দর্শকদের ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও মানবিক দৃষ্টিকোণ উভয়ই অনুভব করতে সহায়তা করে।
চিলি ও ল্যাটিন আমেরিকান চলচ্চিত্র ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এই ধরণের থ্রিলারকে প্রধানধারার উৎসবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে সমালোচকরা উল্লেখ করেছেন। সামরিক দমন নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নৈতিক দ্বন্দ্বের বিষয়গুলোকে চলচ্চিত্রটি সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরেছে, যা বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে ‘পার্সপেকটিভস’ শাখার অংশ হিসেবে বিশ্বপ্রদর্শনী হওয়ায় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সমালোচক ও শিল্পকর্মের প্রেমিকদের কাছ থেকে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পেয়েছে। বিশেষ করে কালো-সাদা চিত্রশৈলী ও নাটকীয় বর্ণনা পদ্ধতি প্রশংসিত হয়েছে, যা দর্শকদের অতীতের অন্ধকারকে পুনরায় চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করে।
বিক্রয় সংস্থা প্রিমিয়াম ফিল্মসের মতে, চলচ্চিত্রটি ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও ল্যাটিন আমেরিকায় থিয়েটার ও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পেতে প্রস্তুত। এই ধরনের বিতরণ পরিকল্পনা চলচ্চিত্রের বার্তা ও শিল্পমূল্যকে বৃহত্তর দর্শকের কাছে পৌঁছে দিতে সহায়তা করবে।
‘দ্য রেড হ্যাঙ্গার’ কেবল চিলি ইতিহাসের একটি দিককে আলোকিত করে না, বরং মানবিক ন্যায়বিচার ও নৈতিক দায়িত্বের প্রশ্নকে সমসাময়িক সমাজে পুনরায় উত্থাপন করে। চলচ্চিত্রটি দেখার পর দর্শকরা অতীতের অন্ধকার থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমানের ন্যায়বিচার ও মানবিকতা রক্ষার জন্য কীভাবে পদক্ষেপ নিতে পারে তা নিয়ে ভাবতে পারেন।



