২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতীয় নির্বাচনের পর বাংলাদেশে সরকার গঠনের প্রত্যাশা বাড়ছে। তবে বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন না করা পর্যন্ত গণতন্ত্রের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা কঠিন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেশের ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণে অর্থনীতির মুক্তি মূল চাবিকাঠি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
১৯৭১ সালের স্বাধীনতা অর্জনের পরপরই ১৯৭৪ সালে দেশটি বিশাল দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হয়, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার সূচনা করে। দুর্ভিক্ষের পরপরই শাসন কাঠামোতে পরিবর্তন আসে, তবে তা তৎক্ষণাৎ স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়নি। এই সময়ে দেশের কৃষি উৎপাদন ক্ষমতা ও খাদ্য নিরাপত্তা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
১৯৯১ সালে গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণ দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। বহু পার্টির অংশগ্রহণে নির্বাচনী প্রক্রিয়া চালু হয় এবং মৌলিক নাগরিক অধিকার পুনরুদ্ধার হয়। তবে গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার সত্ত্বেও অর্থনৈতিক কাঠামোতে প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।
সেই পর থেকে গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা বিভিন্ন সময়ে বাধাগ্রস্ত হয়েছে, যা রাজনৈতিক অস্থিরতা ও শাসক গোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ বিরোধের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। এই বিরোধের ফলে নীতি নির্ধারণে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি ধীর হয়ে যায়। ফলে গণতন্ত্রের স্বতন্ত্রতা প্রায়ই অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে হুমকির মুখে পড়ে।
বর্তমান সময়ে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এখনও পূর্ণাঙ্গভাবে অর্জিত হয়নি, যদিও দেশের সামগ্রিক জিডিপি বৃদ্ধি পেয়েছে। বিনিয়োগ পরিবেশ, আর্থিক নীতি এবং বাণিজ্যিক কাঠামোতে কাঠামোগত সমস্যাগুলি অব্যাহত রয়েছে, যা উৎপাদনশীলতা ও রপ্তানি সক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করে। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ছাড়া নাগরিকের মৌলিক জীবনের মান উন্নয়ন কঠিন বলে বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন।
বাংলাদেশের মাটি অত্যন্ত উর্বর এবং বিভিন্ন ধরণের শস্য উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত, যা দেশীয় চাহিদা পূরণে সক্ষম। তবে দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনার অভাবে প্রায়ই খাদ্যপণ্য আমদানি করতে বাধ্য হচ্ছে, যা বাণিজ্য ঘাটতি বাড়িয়ে দিচ্ছে। সঠিক নীতি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগালে রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ সাড়ে তিন বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কৃষিপণ্য আমদানি করবে। এই চুক্তি দেশের কৃষি খাতের জন্য নতুন বাজার উন্মুক্ত করবে এবং বাণিজ্যিক ভারসাম্য রক্ষায় সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে চুক্তির বাস্তবায়ন ও স্থানীয় উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির মধ্যে সমন্বয় না হলে তা দীর্ঘমেয়াদী সমাধান নাও হতে পারে।
অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের জন্য জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হচ্ছে। শাসক গোষ্ঠী, ব্যবসা সম্প্রদায় এবং নাগরিক সমাজের সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন কঠিন। আসন্ন নির্বাচনের ফলাফল যদি অর্থনৈতিক সংস্কারের দিকনির্দেশনা স্পষ্ট করে, তবে গণতন্ত্রের স্থায়িত্বের জন্য প্রয়োজনীয় ভিত্তি গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
সারসংক্ষেপে, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ছাড়া গণতন্ত্রের স্বতন্ত্রতা ও স্থায়িত্ব বজায় রাখা চ্যালেঞ্জিং রয়ে যায়। দেশের উর্বর মাটি, ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সুযোগগুলোকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে যদি অর্থনৈতিক নীতি রূপান্তরিত হয়, তবে গণতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদী সাফল্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।



