নোয়াখালী জেলায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ছয়টি আসনের মধ্যে পাঁচটি জেতার পরেও নতুন মন্ত্রিসভায় কোনো প্রতিনিধি না থাকায় রাজনৈতিক পরিবেশে অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। শপথ গ্রহণের পরপরই মঙ্গলবার বিকেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। জেলা নির্বাচনে জয়ের উচ্ছ্বাস মন্ত্রিসভার তালিকা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে ম্লান হয়ে যায়, কারণ স্থানীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের প্রত্যাশা ছিল অন্তত একজন মন্ত্রী অন্তর্ভুক্ত হবে।
বিএনপি জোটের প্রার্থী পাঁচটি আসনে জয়লাভের ফলে নোয়াখালী জেলায় পার্টির প্রভাব আরও দৃঢ় হয়েছে। তবে মন্ত্রিসভার গঠন প্রক্রিয়ায় কোনো নোয়াখালী ভিত্তিক নাম না থাকায় পার্টির অভ্যন্তরে ও বাহিরে প্রশ্ন তোলা হয়েছে যে, জয়ের পরেও কেন জেলা থেকে কোনো মন্ত্রী নির্বাচন করা হয়নি।
সামাজিক মিডিয়ায় পোস্ট, মন্তব্য ও পেশাজীবী ব্যক্তিদের প্রতিক্রিয়া থেকে স্পষ্ট হয় যে, নোয়াখালী ভোটারদের প্রত্যাশা ছিল অন্তত একজন প্রতিনিধির মন্ত্রিসভায় স্থান পাওয়া। এই প্রত্যাশা ঐতিহাসিকভাবে গড়ে উঠেছে, কারণ স্বাধীনতার পর থেকে বেশিরভাগ সরকারেই নোয়াখালীকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ইতিহাসে নোয়াখালী বিএনপির জন্য শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ১৯৯১ সালের পর একতরফা নির্বাচনের সময় বাদে অধিকাংশ আসনই দলটির দখলে ছিল। বিশেষ করে ২০০৮ সালের নির্বাচনে, যখন দেশের বেশিরভাগ জায়গায় অস্থিরতা ছিল, নোয়াখালী থেকে চারটি আসনে জয় অর্জন করা হয়েছিল। এই বছরেও পাঁচটি আসনে জয়লাভের ফলে ঐ ধারাবাহিকতা আরও দৃঢ় হয়েছে।
এমন ফলাফলের পর সাধারণ ধারণা ছিল যে, জোটের কঠিন সময়ে সক্রিয় থাকা নেতাদের মধ্যে কেউ না কেউ মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হবেন। এই প্রত্যাশা বিশেষ করে সেই নেতাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যারা বহুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং রাজনৈতিক সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন।
নোয়াখালী-২ আসনের জয়নুল আবদিন ফারুক ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, বরকতউল্লা বুলু ও মো. শাহজাহান পাঁচবার করে সংসদে স্থান পেয়েছেন। এম মাহবুব উদ্দিন খোকন দ্বিতীয়বার এবং মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম প্রথমবার নির্বাচিত হয়েছেন। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, আন্দোলন‑সংগ্রামে অংশগ্রহণ এবং সংগঠনিক দক্ষতা তাদেরকে স্থানীয় আলোচনার কেন্দ্রে রাখে।
স্বাধীনতার পরের বেশিরভাগ সরকারেই নোয়াখালীকে মন্ত্রিসভায় প্রতিনিধিত্ব করা হয়েছে। বিশেষ করে শি’আউর রহমানের সময় এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শাসনকালে, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন, যা জেলার রাজনৈতিক অবস্থানকে জাতীয় পর্যায়ে শক্তিশালী করেছিল। ঐ ঐতিহাসিক উদাহরণগুলো আজকের প্রত্যাশাকে আরও তীব্র করেছে।
স্থানীয় নেতাদের মধ্যে এই অনুপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশকারী একজন ক্রীড়া সংগঠক, মো. জহীর উদ্দিন, উল্লেখ করেছেন যে, মন্ত্রিসভার তালিকায় নোয়াখালী থেকে কোনো নাম না থাকায় জেলা ও তার জনগণের মনোবল প্রভাবিত হয়েছে। তিনি আরও বলেছিলেন, জয়ের পরেও যদি প্রতিনিধিত্ব না হয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক অবিশ্বাসের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
এই পরিস্থিতি নোয়াখালী জেলায় ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথকে প্রভাবিত করতে পারে। মন্ত্রিসভায় প্রতিনিধিত্ব না পাওয়া পার্টির ভিতরে নেতাদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়াতে পারে এবং পরবর্তী নির্বাচনে ভোটারদের মনোভাব পরিবর্তন করতে পারে। অন্যদিকে, সরকার যদি পরবর্তীতে কোনো মন্ত্রী পদে নোয়াখালী ভিত্তিক কাউকে অন্তর্ভুক্ত করে, তবে এই অস্বস্তি কমে যেতে পারে।
বাংলাদেশ সরকার এখনো মন্ত্রিসভার পুনর্গঠন বা অতিরিক্ত মন্ত্রী নিয়োগের কোনো পরিকল্পনা প্রকাশ করেনি। তবে নোয়াখালী থেকে প্রত্যাশিত প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি পার্টির অভ্যন্তরীণ সমন্বয় ও কৌশলগত সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন, ভবিষ্যৎ মন্ত্রিসভা গঠনের সময় এই বিষয়টি পুনরায় বিবেচনা করা হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, নোয়াখালী জেলায় পাঁচটি আসনে জয়লাভের পরেও মন্ত্রিসভায় কোনো প্রতিনিধি না থাকায় রাজনৈতিক অস্বস্তি সৃষ্টি হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে মন্ত্রিসভায় প্রতিনিধিত্বের ধারাবাহিকতা ভাঙা এই ঘটনা পার্টির অভ্যন্তরীণ সমন্বয়, ভোটারদের আস্থা এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনী কৌশলে প্রভাব ফেলবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।



