অস্ট্রেলিয়া এবং ডেনমার্ক সহ কয়েকটি দেশ সাম্প্রতিক মাসে শিশু ও কিশোরদের সামাজিক মিডিয়া প্রবেশ সীমিত করার আইনি পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়া ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ১৬ বছরের নিচের বয়সের ব্যবহারকারীদের জন্য ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, আর ডেনমার্ক নভেম্বর ২০২৫-এ ১৫ বছরের নিচের শিশুদের জন্য সমান ধরণের বিধান প্রণয়নের প্রস্তুতি জানিয়েছে। উভয় উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হল অনলাইন সাইবারবুলিং, আসক্তি, মানসিক চাপ এবং শিকারী সংস্পর্শের ঝুঁকি কমানো।
অস্ট্রেলিয়ার নতুন নিয়মে মেটা, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট, থ্রেডস, টিকটক, এক্স, ইউটিউব, রেডিট, টুইচ এবং কিকের মতো প্রধান প্ল্যাটফর্মে ১৬ বছরের নিচের শিশুদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে হোয়াটসঅ্যাপ এবং ইউটিউব কিডস এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত নয়। সরকার উল্লেখ করেছে যে, এই প্ল্যাটফর্মগুলোকে ব্যবহারকারী বয়স নিশ্চিত করার জন্য একাধিক যাচাই পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে, শুধুমাত্র স্ব-প্রকাশিত বয়সের ওপর নির্ভর করা যাবে না।
বয়স যাচাইয়ের জন্য অস্ট্রেলিয়ান কর্তৃপক্ষ ডিজিটাল পরিচয়পত্র, সরকারী ডেটাবেসের সাথে সংযোগ এবং বায়োমেট্রিক তথ্যের সংমিশ্রণ প্রস্তাব করেছে। এই শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে সামাজিক মিডিয়া কোম্পানিগুলোকে সর্বোচ্চ ৪৯.৫ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার (প্রায় ৩৪.৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) জরিমানা আরোপের সম্ভাবনা রয়েছে।
বৈধতা ও গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগও তীব্র। বয়স যাচাই প্রক্রিয়ায় ব্যক্তিগত তথ্যের অতিরিক্ত সংগ্রহের ফলে গোপনীয়তা লঙ্ঘনের ঝুঁকি বাড়বে বলে সমালোচকরা সতর্কতা প্রকাশ করেছে। মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি টেকের মতামত অনুযায়ী, এমন নিষেধাজ্ঞা বাস্তবিকভাবে কার্যকর নাও হতে পারে এবং তরুণ প্রজন্মের অনলাইন আচরণকে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
ডেনমার্কের ক্ষেত্রে সরকার নভেম্বর ২০২৫-এ তিনটি শাসনমণ্ডলীয় দল এবং দুইটি বিরোধী দলের সমর্থন পেয়ে ১৫ বছরের নিচের শিশুদের জন্য সামাজিক মিডিয়া নিষেধাজ্ঞা প্রস্তাব করেছে। সংশ্লিষ্ট আইনটি ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে পার্লামেন্টে গৃহীত হলে কার্যকর হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। ডেনমার্কের পরিকল্পনা অস্ট্রেলিয়ার মডেলকে অনুসরণ করে, তবে নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মের তালিকা ও শাস্তির মাত্রা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
অস্ট্রেলিয়া ও ডেনমার্কের পাশাপাশি ইউরোপ, এশিয়া এবং উত্তর আমেরিকায় বেশ কয়েকটি দেশও অনুরূপ নীতি বিবেচনা করছে। এই দেশগুলো সরকারী নথি, পার্লামেন্টের আলোচনার রেকর্ড এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়া রিপোর্টের ভিত্তিতে সামাজিক মিডিয়া ব্যবহার বয়সসীমা নির্ধারণের আইনি কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। যদিও প্রতিটি দেশের নির্দিষ্ট শর্ত ভিন্ন, তবে লক্ষ্য সবসময়ই তরুণ ব্যবহারকারীদের অনলাইন ঝুঁকি থেকে রক্ষা করা।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, সামাজিক মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করা কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বয়সসীমা নির্ধারণের মাধ্যমে সাইবারবুলিং, অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য অনুপযুক্ত কন্টেন্ট এবং অনলাইন শোষণের সম্ভাবনা হ্রাস পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া, প্ল্যাটফর্মগুলোকে বয়স যাচাইয়ের জন্য প্রযুক্তিগত অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যা ভবিষ্যতে নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তোলার ভিত্তি হতে পারে।
তবে বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জও কম নয়। বয়স যাচাইয়ের সঠিকতা, গোপনীয়তা রক্ষা এবং সরকারী হস্তক্ষেপের সীমা নির্ধারণে জটিলতা রয়ে গেছে। কিছু বিশ্লেষক বলেন, কঠোর নিয়মের পরিবর্তে শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি করা অধিক কার্যকর হতে পারে। তবুও, সরকারগুলো সামাজিক মিডিয়া কোম্পানিগুলোর ওপর দায়িত্ব আরোপের মাধ্যমে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নতুন পথ অনুসন্ধান করছে।
সামাজিক মিডিয়া নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনার গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, অস্ট্রেলিয়া ও ডেনমার্কের পদক্ষেপ অন্যান্য দেশকে অনুকরণ করতে পারে। ভবিষ্যতে বয়স-নির্দিষ্ট ডিজিটাল নীতি কীভাবে গড়ে উঠবে, তা নির্ভর করবে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, জনমত এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে। এই পরিবর্তনগুলো শেষ পর্যন্ত তরুণ প্রজন্মের অনলাইন অভিজ্ঞতাকে আরও নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর করার দিকে লক্ষ্য রাখবে।



