প্রযুক্তি ও মানবিক কল্পনার সংযোগস্থলে নতুন একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। কেভিন অ্যাশটন, যিনি প্রযুক্তি ক্ষেত্রে পরিচিত, তার ‘দ্য স্টোরি অফ স্টোরিজ’ শিরোনামের কাজটি ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত হয়ে $৩২ মূল্যে বাজারে এসেছে। বইটি মানব ইতিহাসে গল্প বলার পদ্ধতির পরিবর্তন ও তার সঙ্গে প্রযুক্তির বিকাশকে একত্রে বিশ্লেষণ করে, এবং কেন গল্প আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ তা ব্যাখ্যা করে।
গল্পের যাত্রা আগুনের চারপাশে শুরু হয়েছে বলে লেখক উল্লেখ করেন। প্রাচীন মানুষ রাতের অন্ধকারে আগুনের তাপে একত্রিত হয়ে দিনের কাজের ক্লান্তি ভুলে, স্মৃতি ও কল্পনা মিশ্রিত করে বর্ণনা শেয়ার করত। এই প্রাচীন সভা থেকে শুরু করে মুদ্রণযন্ত্রের আবিষ্কার, বিদ্যুতের ব্যবহার এবং আজকের স্মার্টফোনের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া গল্পের ধারায় মানবিক যোগাযোগের রূপান্তর স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
বইয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশে ১৯৪৪ সালের একটি মনোবৈজ্ঞানিক পরীক্ষা তুলে ধরা হয়েছে। দুইজন গবেষক অংশগ্রহণকারীদের একটি সংক্ষিপ্ত অ্যানিমেশন দেখার পর তা বর্ণনা করতে বলেছিলেন; ছবিতে কেবল দুটি ত্রিভুজ ও একটি বৃত্ত একটি আয়তক্ষেত্রের মধ্যে চলাচল করছিল। তবু অধিকাংশ দর্শক প্রেম, সংঘর্ষ ও ত্যাগের মতো জটিল কাহিনী গড়ে তুলেছিল। এই ফলাফল দেখায় যে মানব মস্তিষ্ক সর্বনিম্ন ভিজ্যুয়াল সংকেত থেকেও সমৃদ্ধ গল্প তৈরি করতে সক্ষম।
এই ক্ষমতা বিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন। মস্তিষ্কের গল্প-গঠন প্রক্রিয়া তথ্যকে সংযুক্ত করে অর্থপূর্ণ কাঠামোতে রূপান্তরিত করে, যা স্মৃতি সংরক্ষণ ও সামাজিক সংযোগে সহায়তা করে। অ্যাশটন এই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণকে বইয়ের মূল তত্ত্বের সঙ্গে যুক্ত করে দেখিয়েছেন যে, প্রযুক্তি যতই পরিবর্তিত হোক না কেন, গল্পের মৌলিক আকর্ষণ অপরিবর্তিত থাকে।
‘দ্য স্টোরি অফ স্টোরিজ’ ঐতিহাসিক নথি, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং আধুনিক উদাহরণকে একত্রিত করে পাঠকের জন্য একটি সমন্বিত চিত্র উপস্থাপন করে। লেখক প্রাচীন গ্রন্থ থেকে আধুনিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম পর্যন্ত বিভিন্ন উৎস থেকে আকর্ষণীয় তথ্য সংগ্রহ করে, যা পাঠকের কৌতূহল জাগায় এবং বিষয়ের গভীরতা বাড়ায়। উদাহরণস্বরূপ, তিনি মুদ্রণযন্ত্রের উদ্ভব কীভাবে তথ্যের ব্যাপক প্রচারকে সম্ভব করেছে এবং বিদ্যুৎ কীভাবে রেডিও ও টেলিভিশনের মাধ্যমে গল্পের বিস্তারকে ত্বরান্বিত করেছে তা বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
বইয়ের প্রথম অধ্যায়ে আগুনের চারপাশে মানুষের প্রথম গল্প বলার অভ্যাসের বিবরণ দেওয়া হয়েছে। লেখক উল্লেখ করেন, উষ্ণতা ও নিরাপত্তার পরিবেশে মানুষ স্থানীয় ও দূরবর্তী ঘটনার কথা শেয়ার করত, যা কেবল বিনোদনই নয়, জ্ঞান ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের মাধ্যমও ছিল। এই প্রক্রিয়া সমাজের সংহতি বাড়িয়ে তুলেছিল এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সাংস্কৃতিক ভিত্তি স্থাপন করেছিল।
পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে মুদ্রণযন্ত্রের উদ্ভাবন, বিদ্যুতের ব্যবহার এবং ইন্টারনেটের উত্থানকে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি প্রযুক্তিগত অগ্রগতি কিভাবে গল্পের উৎপাদন, বিতরণ ও গ্রহণের পদ্ধতিকে পরিবর্তন করেছে তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বিশেষ করে সামাজিক মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ব্যক্তিগত গল্পের গ্লোবাল শেয়ারিং এখন পূর্বের তুলনায় দ্রুত ও বিস্তৃত হয়েছে, যা বইটির মূল যুক্তিকে সমর্থন করে।
আজকের স্মার্টফোনের যুগে প্রত্যেকেরই গল্প বলার ক্ষমতা রয়েছে, এবং এই বাস্তবতা বইটির সময়োপযোগিতা বাড়িয়ে দেয়। অ্যাশটন পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক না কেন, গল্পের মূল উদ্দেশ্য—মানবিক সংযোগ ও অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি—অবিকল রয়ে যায়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বইটি শুধুমাত্র অতীতের পুনরাবৃত্তি নয়, বরং ভবিষ্যতে গল্পের ভূমিকা কী হতে পারে তা নিয়ে চিন্তা উত্সাহিত করে।
আপনার কি মনে হয়, ডিজিটাল যুগে গল্পের শক্তি কীভাবে নতুন রূপ নিতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ‘দ্য স্টোরি অফ স্টোরিজ’ একটি মূল্যবান দৃষ্টিকোণ প্রদান করে, এবং পাঠকদেরকে তাদের নিজস্ব গল্প গড়ে তোলার জন্য অনুপ্রাণিত করে।



