ইসরাইলের মন্ত্রীপরিষদের সচিব ইয়োসি ফুকসের দেওয়া ৬০ দিনের নিরস্ত্রীকরণ শর্তের মুখে হামাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মাহমুদ মারদাউই আল্টিমেটাম প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা জানালেন। এই সিদ্ধান্তটি জেরুজালেমে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে প্রকাশিত হয়, যেখানে ইসরাইলের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দেওয়া হয়। উভয় পক্ষের অবস্থান স্পষ্ট হওয়ায় গাজার নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি পুনরায় উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইসরাইলের মন্ত্রীপরিষদের সচিব ইয়োসি ফুকস উল্লেখ করেন, যদি হামাস ৬০ দিনের মধ্যে নিরস্ত্রী না করে, তবে ইসরাইল গাজা অঞ্চলে পুনরায় বৃহৎ পরিসরের সামরিক অভিযান চালু করতে পারে। তিনি এই শর্তের ভিত্তি হিসেবে ইসরাইলের নিরাপত্তা উদ্বেগকে তুলে ধরেন এবং গাজার জনগণের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের ইঙ্গিত দেন। ফুকসের মতে, এই সময়সীমা পূরণ না হলে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনী ‘আইডিএফ’কে সম্পূর্ণ অভিযান চালাতে হবে।
ফুকসের বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা উল্লেখ করা হয়; তিনি জানান, ৬০ দিনের শর্তের অনুরোধ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন থেকে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই হস্তক্ষেপের পেছনে শান্তি প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার ইচ্ছা রয়েছে বলে তিনি ব্যাখ্যা করেন। ফুকস যুক্তি দেন, ইসরাইল এই অনুরোধকে সম্মান করে চলমান আলোচনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে।
হামাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মাহমুদ মারদাউই সরাসরি আল‑জাজিরাকে জানালেন, গাজা অঞ্চলে পুনরায় যুদ্ধের হুমকি গুরুতর পরিণতি ডেকে আনবে এবং ফিলিস্তিনি জনগণ কখনো আত্মসমর্পণ করবে না। তিনি জোর দিয়ে বললেন, ইসরাইলের যে কোনও হুমকি গাজার স্থিতিশীলতা ও মানবিক পরিস্থিতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। মারদাউই আরও উল্লেখ করেন, হামাসের কাছে কোনো আনুষ্ঠানিক নিরস্ত্রীকরণ দাবি বা নির্দিষ্ট সময়সীমা সম্পর্কে তথ্য নেই।
মারদাউই বলেন, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং মিডিয়ার মাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্যগুলো শুধুমাত্র হুমকি এবং চলমান আলোচনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কহীন। তিনি যুক্তি দেন, এই ধরনের হুমকি গাজার জনগণের আত্মবিশ্বাসকে ক্ষুন্ন করে এবং শান্তি প্রক্রিয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করে। মারদাউইয়ের মন্তব্যে ইসরাইলের শর্তকে ‘নিচের হুমকি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ইসরাইলের মন্ত্রীপরিষদের সচিব ফুকস ৬০ দিনের শর্তের সুনির্দিষ্ট শুরুর তারিখ নিশ্চিত না করলেও, তিনি উল্লেখ করেন যে এটি ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হতে পারে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ বৈঠকের দিন। ফুকস বলেন, এই শর্তের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হবে এবং যদি ফলপ্রসূ হয় তবে তা ইতিবাচক ফল দেবে। অন্যথায়, ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনীকে সম্পূর্ণ অভিযান চালাতে হবে।
গাজার ‘যুদ্ধবিরতি’ চুক্তির দ্বিতীয় ধাপ জানুয়ারির মাঝামাঝি শুরু হয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র গাজার নিরাপত্তা ও নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়ার তত্ত্বাবধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী গাজায় মোতায়েনের মাধ্যমে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা হবে। তবে ইসরাইলের অবস্থান স্পষ্ট; গাজার ওপর দখল বজায় রাখলে হামাস নিরস্ত্রী হবে না বলে তারা জানিয়েছে।
হামাসের রাজনৈতিক নেতা খালেদ মেশাল, যিনি বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছেন, গাজার নিরস্ত্রীকরণ আহ্বান প্রত্যাখ্যানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। মেশাল বলেন, দখলদার শক্তির অধীনে থাকা জনগণের কাছ থেকে অস্ত্র জব্দ করা হলে তারা সহজ শিকার হয়ে নির্মূল হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। তিনি ইসরাইলের এই নীতি গাজার জনগণের মানবিক অধিকারকে হুমকির মুখে ফেলবে বলে সতর্ক করেছেন।
অক্টোবর ২০২৩ থেকে গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযান চলার ফলে ৭২ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। এই সংখ্যায় বেসামরিক নাগরিক, শিশু ও বৃদ্ধ অন্তর্ভুক্ত, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উদ্বেগের কারণ। গাজার মানবিক সংকট অব্যাহত থাকায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা ও হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।
প্রতিপক্ষের দৃঢ় অবস্থান এবং নিরস্ত্রীকরণ শর্তের পারস্পরিক অস্বীকৃতি গাজার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে। ইসরাইলের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি উদ্যোগের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হতে পারে। গাজার নিরাপত্তা, মানবিক সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য উভয় পক্ষের আলোচনাকে পুনরায় চালু করা জরুরি, নতুবা সংঘাতের পরিসর বাড়তে পারে।



