ঢাকায় সরকার শপথ গ্রহণের পরই গণতন্ত্র সংরক্ষণের কঠিন কাজের মুখোমুখি হয়েছে। নতুন শাসন দল শপথ গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপ স্থাপনকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। তবে ইতিহাস দেখায়, শপথের পরের সময়ই প্রায়ই গণতন্ত্রের পরীক্ষা হয়।
১৯৬৯ সালে পূর্ব পাকিস্তানে জনগণ পাকিস্তানি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে উঠে দাঁড়ায়, যা ১৯৭০ সালে প্রথম জাতীয় নির্বাচনের দরজা খুলে দেয়। ঐ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ স্পষ্ট জয়লাভ করে, তবে শাসনকারী জুন্তা ক্ষমতা হস্তান্তরে অনিচ্ছুক থাকে এবং পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধের সূচনা করে। নয় মাসের কঠোর সংগ্রামের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়।
স্বাধীনতার চতুর্থ বছরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একদলীয় শাসন BAKSAL নামে প্রতিষ্ঠা করেন, যা ১৯৭৫ সালে তার হত্যাকাণ্ডের পর সামরিক অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান এবং সামরিক শাসনের ধারাবাহিকতায় পরিণত হয়। ১৯৮০-এর দশকে ছাত্র আন্দোলন হুমায়ূন সরকারকে চ্যালেঞ্জ করে, শেষ পর্যন্ত ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর সামরিক শাসক HM এরশাদ পদত্যাগ করেন। এই ঘটনা দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ছিল, যা গণতান্ত্রিক শাসনের সম্ভাবনা উন্মোচন করে।
১৯৯১ সালে অস্থায়ী সরকারের তত্ত্বাবধানে বিএনপি জয়লাভের মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হয়। তবে শীঘ্রই রাজনৈতিক সংকট বাড়ে, এবং ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন প্রতিবাদে কারিগরি শাসন ব্যবস্থা (কেয়ারটেকার সরকার) প্রবর্তিত হয়। এই ব্যবস্থা পরবর্তী বছরগুলোতে নির্বাচনী বিরোধের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
২০০৭-২০০৮ সালে কেয়ারটেকার সরকারের নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ তীব্র হয়ে ওঠে, ফলে সামরিক সমর্থিত অস্থায়ী সরকার গঠন হয়। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পুনরায় শাসন গ্রহণ করে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শাসনের স্বভাব ধীরে ধীরে কর্তৃত্ববাদী রূপ নেয়। ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ কেয়ারটেকার ব্যবস্থা বাতিল করে, যা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার কাঠামোকে পরিবর্তন করে। এরপর ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের তিনটি জাতীয় নির্বাচন ব্যাপকভাবে জালিয়াতি ও হেরফেরের অভিযোগের মুখে পড়ে।
বিপক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে, বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী দলগুলো এই নির্বাচনের ফলাফলকে অবৈধ বলে দাবি করে এবং স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ নির্বাচন প্রক্রিয়ার জন্য কেয়ারটেকার ব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা দাবি করে। তারা সরকারকে গণতান্ত্রিক নীতিমালা থেকে বিচ্যুত বলে সমালোচনা করে এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের আহ্বান জানায়।
অন্যদিকে, সরকার পক্ষের যুক্তি হল যে কেয়ারটেকার ব্যবস্থা অতীতের রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়িয়েছে এবং বর্তমান শাসন ব্যবস্থা দেশের উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম। সরকার নির্বাচনের ফলাফলকে বৈধ ঘোষণা করে এবং বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে রাজনৈতিক সমঝোতা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেয়।
ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রভাবের দিক থেকে, বর্তমান শাসনকালের নির্বাচন সংক্রান্ত বিতর্ক দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সুনামকে প্রভাবিত করতে পারে। যদি বিরোধী দলগুলো তাদের দাবিগুলো সফলভাবে উপস্থাপন করতে পারে, তবে নির্বাচনী সংস্কারের জন্য নতুন আইন প্রণয়ন বা কেয়ারটেকার ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তন সম্ভব হতে পারে। অন্যদিকে, সরকার যদি বিদ্যমান কাঠামো বজায় রাখে, তবে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়তে পারে এবং সামাজিক অশান্তি সৃষ্টি হতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, শপথ গ্রহণের পরের সময়ে গণতন্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণ একটি ধারাবাহিক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। অতীতের অভিজ্ঞতা, বর্তমান বিরোধী-সরকারের মতবিরোধ এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনের সম্ভাব্য দিকনির্দেশনা একসাথে দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে নির্ধারণ করবে। সরকার, বিরোধী দল এবং নাগরিক সমাজের সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা কঠিন হবে।



