ঢাকা শহরের ধানমন্ডি এলাকায় ১ নভেম্বর ২০১৯ রাতে দুই নারীকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। ৬৫ বছর বয়সী আফরোজা বেগম এবং তার গৃহকর্মী দিতি (১৮) লোবেলিয়া হাউজের পঞ্চম তলা থেকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। দুজনের গলা কাটা, সোনার চেইন ও মোবাইল ফোন চুরি করা হয় বলে প্রাথমিক তদন্তে সন্দেহের দিক নির্ধারিত হয়।
মামলাটি তদন্তে ঢাকার থানা পুলিশ ও ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ (ডিবি) জড়িত থাকে। তদন্তের ফলস্বরূপ সুরভী আক্তার নাহিদা, যিনি পূর্বে গৃহপরিচারিকা হিসেবে কাজ করতেন, অপরাধীরূপে চিহ্নিত হয়। সুরভীর সঙ্গে অপরাধের পূর্বে তার বোনের বাসা থেকে পোশাক কারখানায় কাজের অভিজ্ঞতা, চাকরি ত্যাগ ও পারিবারিক হিংসা যুক্ত ছিল। ২০১৯ সালে তিনি বাসা ছেড়ে গৃহপরিচারিকা কাজের সন্ধানে ধানমন্ডি এলাকায় প্রবেশ করেন।
সুরভী যখন আফরোজার গৃহকর্মী বাচ্চু মিয়ার সঙ্গে দেখা করেন, তখন বাচ্চু তাকে কাজের প্রস্তাব দেন। সুরভী কাজ গ্রহণ করে এবং দুর্ভিসন্ধি (দুর্ভিক্ষ) নিয়ে গৃহে প্রবেশ করেন। পরবর্তীতে তিনি দিতিকে নির্মমভাবে হত্যা করেন এবং আফরোজা বেগমের গলা কেটে, সোনার চেইন ও মোবাইল ফোন নিয়ে পালিয়ে যান।
মামলাটি আদালতে শোনার পর, ঢাকা সপ্তম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ তাওহিদা আক্তার রায় ঘোষণার আগে দুই সন্দেহভাজনকে কারাগার থেকে আদালতে উপস্থিত করেন। রায়ের পর সুরভীকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয় এবং তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। অন্য অভিযুক্ত বাচ্চু মিয়ার বিরুদ্ধে অন্য কোনো মামলা না থাকায় আদালত তাকে মুক্তির নির্দেশ দেয়। মুক্তির পথে বাচ্চু আদালত থেকে ‘শুকরিয়া’ আদায় করেন, আর সুরভী দাবি করেন যে তাকে ‘ফাঁসানো হয়েছে’।
বিচারক তাওহিদা আক্তার রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে গৃহপরিচারিকা নিয়োগে সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেন। তিনি উল্লেখ করেন, গৃহপরিচারিকা নির্বাচন করার সময় প্রার্থীর পটভূমি, কাজের অভিজ্ঞতা ও পূর্বের রেকর্ড যথাযথভাবে যাচাই করা জরুরি। এই ধরনের সতর্কতা না নিলে গৃহস্থালীর নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
আফরোজা বেগমের পরিবারে এই হত্যাকাণ্ডের প্রভাব গভীর। আফরোজার ফ্ল্যাটের উপরে ও বিপরীত দিকের ফ্ল্যাটে স্বামী-সন্তানসহ বসবাসকারী তার মেয়ে দিলরুবা সুলতানা রুবা, ৩ নভেম্বর এই মামলাটি আদালতে দায়ের করেন। তিনি গৃহপরিচারিকা নিয়োগে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন।
মামলাটির তদন্তে থানা পুলিশ ও ডিবি পুলিশ উভয়ই সক্রিয়ভাবে কাজ করেছে। গৃহপরিচারিকা সুরভীর পূর্বের কাজের ইতিহাস, পারিবারিক হিংসা ও চাকরি ত্যাগের তথ্য সংগ্রহ করে তদন্তে সহায়তা করেছে। এছাড়া, অপরাধস্থল থেকে প্রাপ্ত ফোরেনসিক প্রমাণ, যেমন রক্তের চিহ্ন ও চুরি করা সামগ্রী, অপরাধীর দোষ প্রমাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সুরভীর মৃত্যুদণ্ডের রায় আদালতে আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে কঠোরভাবে বিবেচিত হয়েছে। আদালত তার অপরাধের গুরত্ব, দুইজনের প্রাণহানি ও সম্পত্তি চুরির প্রমাণকে ভিত্তি করে এই শাস্তি প্রদান করেছে। রায়ের পর সুরভীকে কারাগারে পাঠানো হয় এবং মৃত্যুদণ্ডের কার্যকরী ব্যবস্থা শুরু হয়।
বাচ্চু মিয়ার মুক্তি সত্ত্বেও, তার বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের প্রমাণ না থাকায় আদালত তাকে রিলিজ করার নির্দেশ দেয়। তবে তার ‘শুকরিয়া’ গ্রহণের পরও, মামলার সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য সন্দেহভাজন ও সাক্ষীদের ওপর অতিরিক্ত তদন্তের সম্ভাবনা রয়ে যায়।
এই মামলাটি গৃহপরিচারিকা নিয়োগের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা সচেতনতা বাড়ানোর একটি উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষত শহুরে এলাকায় গৃহকর্মীর পটভূমি যাচাই, রেফারেন্স চেক এবং কাজের শর্তাবলী স্পষ্ট করা জরুরি। বিচারকের এই পরামর্শটি গৃহস্থালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।
ধানমন্ডি গৃহপরিচারিকা হত্যাকাণ্ডের রায় ও পরবর্তী নির্দেশনা গৃহকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় সতর্কতা ও আইনি দায়িত্বের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ভবিষ্যতে গৃহপরিচারিকা নিয়োগে যথাযথ যাচাই-বাছাই না করলে অনুরূপ অপরাধের ঝুঁকি বাড়তে পারে, তাই সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে এই দিকটি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে হবে।



