রাশিয়ার সামরিক বাহিনী রাতারাতি ইউক্রেনের বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে ব্যাপক আক্রমণ চালায়, যার ফলে ত্রিশজন কর্মীর মধ্যে তিনজন প্রাণ হারায় এবং দশ হাজারেরও বেশি পরিবার বিদ্যুৎ ও তাপ সরবরাহ থেকে বঞ্চিত হয়। এই আক্রমণটি জেনেভায় নির্ধারিত যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত ত্রিপক্ষীয় শান্তি আলোচনার শুরুর ঠিক আগে ঘটেছে।
ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির জেলেনস্কি সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত বার্তায় এই আক্রমণকে “সমন্বিত” এবং “শক্তি খাতে সর্বোচ্চ ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত” বলে নিন্দা করেন। তিনি কূটনৈতিক সমাধানকে “ন্যায় ও শক্তি” দিয়ে সমর্থন করার আহ্বান জানান।
এই ঘটনার পটভূমিতে রয়েছে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রিক আক্রমণ, যা থেকে ইউক্রেনের শক্তি সেক্টর ক্রমাগত লক্ষ্যবস্তু হয়ে আসছে। শীতকালে বিশেষ করে বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও তাপ সরবরাহ নেটওয়ার্কে ধারাবাহিক আক্রমণ চালিয়ে রাশিয়া দেশের নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা বাধাগ্রস্ত করার কৌশল অনুসরণ করছে।
ডিপার্টমেন্ট অফ এনার্জি মন্ত্রী আর্টেম নেক্রাসভের মতে, ত্রিশজন কর্মীর মধ্যে তিনজনের মৃত্যু ঘটেছে যখন রাশিয়ার একটি ড্রোন স্লোভিয়ান্স্ক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিকটবর্তী এলাকায় তাদের গাড়ি আঘাত করে। স্লোভিয়ান্স্কের এই সীমান্তবর্তী অঞ্চলটি রাশিয়া কায়েভকে শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবে ছেড়ে দিতে চায়।
ওডেসার কৌশলগত কালো সাগর বন্দর শহরের বিদ্যুৎ সরবরাহে “অত্যন্ত গুরুতর” ক্ষতি হয়েছে, যা দেশের অন্যতম বড় শক্তি কোম্পানি ডিটিইকে জানিয়েছে। কোম্পানির সামাজিক মাধ্যমের পোস্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত সরঞ্জামগুলো পুনরুদ্ধার করতে দীর্ঘ সময় লাগবে।
নেক্রাসভ আরও জানান, আক্রমণের ফলে পাঁচটি অঞ্চলে বাড়িগুলো বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়েছে এবং ওডেসা ও উত্তরের সুমি শহরে তাপ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে। এই অঞ্চলগুলোতে শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানবিক চ্যালেঞ্জ বাড়ছে।
ইউক্রেনীয় বিমান বাহিনী রাশিয়ার আক্রমণকে প্রায় ৪০০টি ড্রোন এবং ২৯টি ক্ষেপণাস্ত্রের সমন্বয়ে ঘটিত বলে রিপোর্ট করেছে। অধিকাংশ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা হয়েছে, তবে ১৩টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে। এই তথ্যগুলো আক্রমণের পরিসর ও রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেয়।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, জেনেভায় নির্ধারিত ত্রিপক্ষীয় আলোচনায় রাশিয়া ও ইউক্রেনের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন রয়েছে। বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এই সময়ে আক্রমণ চালিয়ে রাশিয়া কায়েভকে আলোচনার টেবিলে আরও বেশি চাপে রাখতে চায়। তবে জেলেনস্কি জোর দিয়ে বলেছেন, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ন্যায়বিচার ও শক্তির ভিত্তিতে এগিয়ে নিতে হবে।
ইউক্রেনের সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থা এই আক্রমণকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করেছে এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা আরোপের সম্ভাবনা উত্থাপন করেছে। একই সঙ্গে, মানবিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তা বাড়ার ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো দেশগুলো থেকে তাপ ও বিদ্যুৎ সরবরাহে জরুরি সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
অবশিষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর মেরামত কাজের জন্য বিশেষজ্ঞ দলগুলোকে ত্বরিতভাবে কাজ করতে হবে, তবে ডিটিইকের মতে পূর্ণ পুনরুদ্ধার কয়েক সপ্তাহ থেকে মাসের মধ্যে সম্ভব হবে না। তাপ ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা, বিশেষ করে শীতের মৌসুমে, মানবিক সংকট কমাতে গুরুত্বপূর্ণ হবে। জেনেভায় নির্ধারিত আলোচনার ফলাফল এবং রাশিয়ার ভবিষ্যৎ কৌশলই এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার মূল নির্ধারক হবে।



