১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯, আজিমপুরে তামাদ্দুন মজলিস গঠিত হয়, যার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান ছিলেন ড. আবুল কাশেম, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও প্রিন্সিপাল। তিনি বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা ও শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছিলেন, যা দেশের ঐক্য ও নাগরিকদের সহজ শিক্ষার ভিত্তি হবে।
ড. কাশেমের বাসস্থান ও কর্মস্থল একই ঠিকানায় থাকায় তিনি দৈনন্দিন জীবনে বাংলা ভাষা সংক্রান্ত ভাবনা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতেন। তার কাছাকাছি বন্ধু ও সহকর্মী সাইয়দ নাজরুল ইসলাম ও শামসুল আলম তামাদ্দুন মজলিসের সূচনায় সরাসরি অংশ নেন, ফলে সংগঠনের ভিত্তি দৃঢ় হয়।
তামাদ্দুন মজলিসের প্রধান কাজ ছিল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও অন্যান্য স্থানীয় স্থানে সাহিত্যিক সভা ও সেমিনার আয়োজন করা। এই সভাগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ-পশ্চিম লনে এবং মুসলিম হল অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হতো, যেখানে ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষাবিদরা বাংলা ভাষার মর্যাদা নিয়ে আলোচনা করতেন।
সচেতনতা বাড়াতে সংগঠনটি বিভিন্ন বিবৃতি ও হ্যান্ডবিল প্রকাশ করত। ড. কাশেমের সম্পাদিত প্রথম পুস্তিকাটি “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু?” শিরোনামে ১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭-এ প্রকাশিত হয়, যা বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা দাবি করার প্রথম লিখিত নথি হিসেবে স্বীকৃত। পুস্তিকায় বলা হয়েছে, যে ভাষা জাতির শক্তি বজায় রাখে এবং নাগরিকদের সহজে শেখা ও ব্যবহার করা যায়, সেটিই রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত।
“পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু?” প্রকাশের পর তা দ্রুত পাঠক ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। পুস্তিকাটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, পাবলিক লাইব্রেরি ও রাজনৈতিক সমাবেশে বিতরণ করা হয়, ফলে বাংলা ভাষা সংক্রান্ত মতবিনিময় তীব্রতর হয়।
তামাদ্দুন মজলিসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল সাপ্তাহিক পত্রিকা “সৈনিক” চালু করা, যা ভাষা আন্দোলনের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করে। এই প্রকাশনা মাধ্যমে আন্দোলনের লক্ষ্য, কার্যক্রম ও প্রয়োজনীয়তা ব্যাপকভাবে জনসাধারণের কাছে পৌঁছায়।
ড. কাশেমের নেতৃত্বে তামাদ্দুন মজলিসের এই সমন্বিত কার্যক্রম ভাষা আন্দোলনের ভিত্তি গড়ে তুলতে সহায়ক হয়। বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষা হওয়ার দাবি পরবর্তীতে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রক্তবিরতির মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছায়, যা আজকের বাংলা দিবসের মূল ভিত্তি।
বছরের পর বছর পর, তামাদ্দুন মজলিসের প্রতিষ্ঠা ও ড. কাশেমের অবদান ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে অমলিন রয়ে গেছে। ১৯৯৩ সালে মোস্তফা কামাল সংকলিত “ভাষা আন্দোলন শচিত্রে থকে বানা” গ্রন্থে এই সাক্ষাৎকারের অনুবাদিত অংশ প্রকাশিত হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ গবেষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূত্র সরবরাহ করে।
ড. আবুল কাশেমের তামাদ্দুন মজলিসের মাধ্যমে বাংলা ভাষা সংরক্ষণে করা প্রচেষ্টা এবং প্রথম পুস্তিকার প্রকাশের ঐতিহাসিক গুরুত্ব আজও রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। এই ঐতিহাসিক ঘটনা দেশের ভাষা নীতি গঠনে প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ভাষা অধিকার রক্ষার উদাহরণ হিসেবে কাজ করে।



