বগুড়া শহরে নির্বাচনের পর তিন ধারাবাহিক দিনে তিনটি হিংসাত্মক হত্যিকাণ্ড ঘটেছে, যার ফলে বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় পুলিশ এখনো কোনো সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করতে পারেনি এবং দুইটি মামলায় কোনো সূত্র পাওয়া যায়নি।
১৪ ফেব্রুয়ারি শনিবার রাতের দিকে সাইফুল ইসলামের বাড়ি থেকে ফিরে না আসার পর, তার পরিবার উদ্বিগ্ন হয়ে প্রতিবেশীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। পরের দিন, রবিবার সকালবেলা, প্রতিবেশীরা ঘাসের জমিতে সাইফুলের গলা কাটা মৃতদেহ আবিষ্কার করে। তার বড় মেয়ে সাদিয়া জানান, ব্যবসায়িক কাজের কারণে সাইফুল প্রায়ই রাতের দেরিতে বাড়ি ফিরতেন, তাই এই ঘটনার পূর্বে তারা কোনো সন্দেহ প্রকাশ করেনি।
একই সপ্তাহের শনিবার, ভোটের ছুটি শেষ হয়ে ফাহিম নামের এক তরুণ তার কর্মস্থলে যাওয়ার পথে বগুড়া সদর উপজেলা পরিষদের সামনে আক্রমণের শিকার হন। তনয় নামের এক যুবক পিছন থেকে ফাহিমের ওপর হিংসাত্মক আক্রমণ চালায়। স্থানীয়রা ফাহিমকে তৎক্ষণাৎ উদ্ধার করে টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণে না পারায়, তাকে পরে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয় এবং দুপুর ১২টায় তার মৃত্যু ঘটে।
ফাহিমের দুলাভাই মেহেদী হাসান জানান, তনয় পূর্বে ফাহিমকে একাধিকবার ক্ষতি করার হুমকি দিয়েছিল এবং এ বিষয়ে গ্যাংস্টার্ডম (জিডিও) করা হলেও পুলিশ তা গ্রহণ করেনি। তনয় ও তার সহচররা কয়েক দিন ধরে ফাহিমকে অনুসরণ করছিল, এবং শেষবারের আক্রমণটি ফ্যাক্টরিতে যাওয়ার পথে ঘটেছে। তিন দিন পরেও কোনো গ্রেফতার হয়নি। রবিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) বিকালে বগুড়া সদর থানায় তনয়সহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়।
অন্যদিকে, নির্বাচনের কারণে পুরো শহর বন্ধ থাকায়, পরের দিন শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৯:৩০ টার দিকে আলিফ নামের এক যুবক তার বাবার গ্যারেজে কাজ শুরু করে। পাঁচ মাস আগে তিনি গ্যারেজে কাজ শিখছিলেন। একই সময়ে তার বাবা রিপন মিয়া আলিফের সঙ্গে কাজের কথা উল্লেখ করেন। তবে এক ঘণ্টা পরে স্থানীয়দের কাছ থেকে আলিফের সঙ্গে ঘটনার খবর আসে; তদন্তের ফলাফল এখনও প্রকাশিত হয়নি, তবে জানা যায় যে ঘটনায় তার মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে।
স্থানীয় বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, নির্বাচনের পর নিরাপত্তা ব্যবস্থার শিথিলতা অপরাধীদের জন্য সুযোগ তৈরি করেছে। তারা দাবি করেন, সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ও কিশোর গ্যাংগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়ায় এই ধরণের হিংসা বৃদ্ধি পেয়েছে।
পুলিশের মতে, তিনটি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে দুটি এখনও সূত্রহীন এবং কোনো সন্দেহভাজন চিহ্নিত করা যায়নি। তারা জানিয়েছে, তদন্ত চলমান এবং প্রমাণ সংগ্রহের জন্য স্থানীয়দের সহযোগিতা চাওয়া হচ্ছে। এছাড়া, তনয় ও তার সহচরদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় প্রমাণ সংগ্রহের কাজ চলছে, তবে এখনো গ্রেফতার হয়নি।
বগুড়া শহরের সাধারণ মানুষ নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। তারা দাবি করছেন, নির্বাচনের পর প্রয়োগ করা অস্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে, গ্যাং ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কার্যক্রম রোধে তৎক্ষণাত পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা উল্লেখ করেন, হিংসা বাড়লে ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায় এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি বাড়ে।
আইনি দিক থেকে, ফাহিমের হত্যাকাণ্ডে তনয়সহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক মামলা দায়ের করা হয়েছে। সাইফুলের ক্ষেত্রে, তার পরিবারের কাছ থেকে কোনো সন্দেহভাজনের নাম প্রকাশিত হয়নি, তবে পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। আলিফের ঘটনার জন্যও তদন্ত শুরু হয়েছে, তবে এখনো কোনো সন্দেহভাজন চিহ্নিত করা যায়নি।
সামগ্রিকভাবে, বগুড়ার তিনটি ধারাবাহিক হত্যিকাণ্ড স্থানীয় প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুনর্বিবেচনা, গ্যাং-সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কার্যক্রম দমন এবং দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে পুনরায় শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা জরুরি। বাসিন্দারা আশা করছেন, শীঘ্রই যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং ভবিষ্যতে এমন হিংসা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গৃহীত হবে।



