বারিশাল শহরে আজ (১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) জিবনানন্দ দাসের ১২৭তম জন্মশতবার্ষিকী স্মরণে একাধিক সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় কবি, লেখক ও সংস্কৃতি কর্মীরা মিলিত হয়ে কবির স্মৃতিকে সম্মান জানাতে বিভিন্ন কার্যক্রমের আয়োজন করেন। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ছিল দাসের সাহিত্যিক উত্তরাধিকারকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং তার জন্মস্থানকে গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রূপান্তর করা।
সকালবেলায় প্রগতি লেখক সংঘ ও বারিশাল কবিতা পরিষদের সদস্যরা জিবনানন্দ দাসের স্মৃতিস্তম্ভের সামনে ফুলের পুষ্পমালা অর্পণ করেন। স্মৃতিস্তম্ভটি জিবনানন্দ দাসের পারিবারিক বাড়িতে গড়ে ওঠা স্মারক অডিটোরিয়াম ও গ্রন্থাগারে অবস্থিত, যা সম্প্রতি পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। উপস্থিতরা কবির জীবনী ও রচনাবলী নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করে স্মরণীয় মুহূর্তগুলো ভাগ করে নেন।
এরপর একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়, যার সভাপতিত্ব কবি তপনকোর চক্রবর্তী করেন। সভায় অংশগ্রহণকারীরা দাসের জন্মভবন সারবনন্দা ভবনে গবেষণা কেন্দ্র, বিশাল গ্রন্থাগার এবং জাদুঘর প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। বর্তমান সময়ে ঐ ভবনটি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগে ব্যবহৃত হলেও, অংশগ্রহণকারীরা এর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যকে পুনরায় জোর দিয়ে তুলে ধরেন।
আলোচনার সময় জিবনানন্দ দাসের শিক্ষাকালীন ইতিহাসের ওপরও আলোকপাত করা হয়। তিনি ১৯৩৫ থেকে ১৯৪৬ পর্যন্ত সরকারী ব্রাজমোহন কলেজে ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, এবং তার নামের একটি ডরমিটরি প্রতিষ্ঠিত হলেও, তার সাহিত্যিক কাজের গবেষণা ও প্রচার যথেষ্ট মাত্রায় এগোয়নি। এই ঘাটতি দূর করতে বিশেষায়িত গবেষণা ইউনিটের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করা হয়।
একজন বক্তা উল্লেখ করেন, বারিশাল থেকে দূরবর্তী দর্শনার্থীরা প্রায়ই দাসের স্মৃতির যথাযথ সংরক্ষণ না হওয়ায় হতাশ হন। তিনি বলেন, শহরের পর্যটন ও শিক্ষামূলক সম্ভাবনা বাড়াতে এই বিষয়টি দ্রুত সমাধান করা জরুরি। এই মন্তব্যটি স্থানীয় প্রশাসন ও সংস্কৃতি সংস্থার দায়িত্বের প্রতি দৃষ্টিপাত করে।
জিবনানন্দ দাসকে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর এবং বিশ্বসাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তার রচনাকে আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে ক্লিন্টন বি. সিলি নামের গবেষকের অবদানও সম্মানিত হয়। সিলি ইংরেজি অনুবাদ ও সমালোচনামূলক গবেষণার মাধ্যমে দাসের কাজকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছেন।
অনুষ্ঠানে তুনুরাণী কর্মকার, অপূর্ব গৌতম, আবুল কালাম আজাদ, শোভন কর্মকার এবং সুবাস চন্দ্র দাসসহ বহু স্থানীয় বুদ্ধিজীবী অংশ নেন। তারা কবির জীবন, রচনা এবং শিক্ষামূলক দিক নিয়ে মতবিনিময় করেন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যান।
সকাল দশটায় দ্বিতীয় একটি আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান জিবনানন্দ দাস স্কোয়ারে অনুষ্ঠিত হয়, যা উত্তরণ সাংস্কৃতিক সংগঠন পরিচালনা করে। এই অনুষ্ঠানটি সরকারী ব্রাজমোহন কলেজের ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত হওয়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপিত হয়। উপস্থিত শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা কবির কবিতার পাঠ ও সঙ্গীত পরিবেশনা উপভোগ করেন।
উক্ত অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন উপ-প্রধান শিক্ষক প্রফেসর আবু তাহের মোহাম্মদ রশেদুল ইসলাম। তিনি সভার উদ্বোধন করে পূর্বপ্রধান শিক্ষক প্রফেসর এস.এম. ইমানুল হাকিম, প্রফেসর মোহাম্মদ মোহিউদ্দিন চৌধুরী, সহকারী অধ্যাপক সঙ্গীতা সরকার এবং সহকারী অধ্যাপক জাহিরুল ইসলামকে বক্তব্য দেওয়ার জন্য আহ্বান জানান। প্রত্যেক বক্তা দাসের সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং শিক্ষাক্ষেত্রে তার প্রভাব নিয়ে আলোকপাত করেন।
সমগ্র কার্যক্রমে দেখা যায়, জিবনানন্দ দাসের স্মৃতি সংরক্ষণ ও গবেষণার জন্য স্থানীয় সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ। ভবিষ্যতে গবেষণা কেন্দ্র ও জাদুঘরের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে, বারিশাল শহরটি সাহিত্যিক পর্যটনের নতুন গন্তব্যে পরিণত হতে পারে। পাঠকবৃন্দের জন্য একটি ব্যবহারিক প্রশ্ন: আপনার এলাকার কোনো বিখ্যাত সাহিত্যিকের স্মৃতি সংরক্ষণে আপনি কী ধরনের উদ্যোগ নিতে পারেন?



