মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ৯ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি, যা অস্থায়ী সরকার এবং ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে, তা বাংলাদেশ ব্যাংকের বাণিজ্য, জ্বালানি ও নিরাপত্তা নীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। চুক্তির কিছু শর্তের অধীনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাহিদা পূরণ না হলে চুক্তি বাতিল এবং শুল্ক পুনরায় আরোপের সম্ভাবনা রয়েছে।
বাণিজ্য চুক্তির সমালোচকরা উল্লেখ করছেন যে, এতে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসন সীমিত হতে পারে। বিশেষ করে, চুক্তিতে এমন ধারাগুলি রয়েছে যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে চুক্তি বাতিলের অধিকার দেয়, যদি নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ না হয়।
ডিজিটাল বাণিজ্য সুবিধা সংক্রান্ত ধারা অনুযায়ী, যদি বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো তৃতীয় দেশের সঙ্গে নতুন ডিজিটাল বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থকে হুমকির মুখে ফেলে, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি বাতিল করে ৩৭ শতাংশের পারস্পরিক শুল্ক পুনরায় আরোপ করতে পারে। এই শুল্কের হার এপ্রিল ২০২৫-এ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত হার ছিল।
একই শর্তটি নতুন দ্বিপাক্ষিক মুক্ত বাণিজ্য বা অগ্রাধিকারমূলক চুক্তির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, যদি সেই চুক্তি এমন কোনো “অ-বাজার দেশ”‑এর সঙ্গে হয়, যাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাজার অর্থনীতি হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। এমন ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে চুক্তি প্রত্যাহার এবং শুল্ক আরোপের অধিকার সংরক্ষিত থাকবে।
চুক্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, যদি বাংলাদেশ ব্যাংক এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরামর্শের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান না হয়, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি থেকে সরে গিয়ে ৩৭ শতাংশ শুল্ক পুনরায় আরোপ করতে পারে। এই শুল্কের হার বাংলাদেশ ব্যাংকের যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি মূল্যের উপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা পণ্য, বিশেষ করে পোশাক শিল্পের পণ্য, মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় এক পঞ্চমাংশ গঠন করে। শুল্কের হারের বৃদ্ধি এই সেক্টরের রপ্তানি আয়কে তীব্রভাবে কমিয়ে দিতে পারে, যা শিল্পের কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা হল পারমাণবিক সরঞ্জাম ক্রয়ের উপর সীমাবদ্ধতা। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর, জ্বালানি রড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এমন কোনো দেশ থেকে কিনতে পারবে না, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থকে ক্ষতি করে।
তবে, চুক্তিতে একটি ব্যতিক্রম রয়েছে: যদি কোনো নির্দিষ্ট উপাদান বা প্রযুক্তি শুধুমাত্র একক সরবরাহকারী থেকে পাওয়া যায়, অথবা চুক্তি কার্যকর হওয়ার পূর্বে চুক্তিবদ্ধ হয়ে থাকে, তবে তা ক্রয় করা যাবে। এই ব্যতিক্রমের ফলে রাশিয়ান রাষ্ট্র সংস্থা রোসাটোমের সহায়তায় নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও উপকরণ সরবরাহ অব্যাহত থাকতে পারে।
অন্যদিকে, ভবিষ্যতে রূপপুরের অতিরিক্ত রিঅ্যাক্টর বা অন্য কোনো পারমাণবিক প্রকল্পে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিরোধী সরবরাহকারী থেকে উপকরণ সংগ্রহে বাধা আসতে পারে। এই শর্তটি বাংলাদেশ ব্যাংকের পারমাণবিক কৌশল ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার দিকনির্দেশনা পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।
সামগ্রিকভাবে, চুক্তির শর্তগুলি বাংলাদেশ ব্যাংকের বাণিজ্য নীতি, রপ্তানি প্রবাহ এবং পারমাণবিক শক্তি পরিকল্পনার ওপর দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। শুল্কের সম্ভাব্য পুনরায় আরোপ এবং ডিজিটাল ও পারমাণবিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা, উভয়ই দেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও কৌশলগত বিকল্পকে প্রভাবিত করবে। নীতি নির্ধারকদের এখন এই শর্তগুলির প্রভাব বিশ্লেষণ করে, প্রয়োজনীয় সমন্বয় ও বিকল্প কৌশল গড়ে তোলার সময় এসেছে।



