রমজান মাসে ইফতার ও সেহরির জন্য বাড়তি খাবার ও সামগ্রীর চাহিদা স্বাভাবিকভাবে বাড়ে, ফলে পরিবারের মাসিক ব্যয়ও তীব্রভাবে বৃদ্ধি পায়। এই সময়ে পরিকল্পনা ও সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করলে খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব, পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ নিশ্চিত করা যায়। নিচে রোজা চলাকালীন ব্যয় কমাতে কার্যকর কিছু উপায় তুলে ধরা হলো।
প্রথম ধাপ হল রোজা শুরুর আগে একটি স্পষ্ট বাজেট তৈরি করা। ইফতার ও সেহরির জন্য প্রয়োজনীয় সব আইটেমের তালিকা লিখে বাজারে যাওয়া অতিরিক্ত বা অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা কমিয়ে দেয়। সাত দিনের জন্য সহজ মেনু পরিকল্পনা করলে কোন খাবার কত পরিমাণে দরকার হবে তা আগে থেকেই জানা যায়, ফলে হঠাৎ সিদ্ধান্তে অতিরিক্ত ব্যয় এড়ানো যায়।
দ্বিতীয়ত, মৌসুমি ও দেশীয় পণ্যের দিকে নজর দেওয়া উচিত। আমদানি করা ফল যেমন মাল্টা, আপেল, আঙুরের দাম সাধারণত বেশি থাকে, যেখানে কলা, পেঁপে, বরই, তরমুজ ও আনারসের মতো দেশীয় ফল সাশ্রয়ী এবং সহজলভ্য। মৌসুমী ফলের সরবরাহ বেশি থাকায় দাম তুলনামূলকভাবে কম থাকে, ফলে একই পরিমাণে পুষ্টি কম খরচে পাওয়া যায়।
একই সময়ে, একাধিক প্রয়োজনীয় সামগ্রী একসঙ্গে কিনে আনা পরিবহন খরচ কমাতে সাহায্য করে। দূরের বাজারে কখনও কখনও দাম কম হতে পারে, তবে একবারে বড় পরিমাণে কেনা এবং সঠিকভাবে সংরক্ষণ করলে অতিরিক্ত ব্যয় এড়ানো যায়। এই পদ্ধতি বিশেষ করে বড় পরিবারের জন্য কার্যকর, যেখানে একাধিক খাবার প্রস্তুত করতে হয়।
তৃতীয় কৌশল হল ভাজাপোড়া ও উচ্চমূল্যের খাবারের পরিমাণ সীমিত করা। ইফতারে প্রায়শই ফাস্ট ফুড, বিরিয়ানি, মিষ্টান্নের মতো ব্যয়বহুল খাবার দেখা যায়, যা শুধু ব্যয় বাড়ায় না, স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফল, তাজা সালাদ, ডাল বা ঘরে তৈরি শরবত সাশ্রয়ী এবং পুষ্টিকর বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
পুষ্টিবিদের মতে, ফল ও শাকসবজি থেকে প্রাপ্ত ভিটামিন ও ফাইবার রোজা চলাকালীন শক্তি বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অতিরিক্ত তেলযুক্ত খাবার কমিয়ে দিলে হজমের সমস্যাও কমে এবং রোজা রক্ষার সময় শরীরের স্বাভাবিক কাজকর্ম বজায় থাকে। তাই ইফতার মেনুতে হালকা ও পুষ্টিকর আইটেম অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
চতুর্থ কৌশল হল বাজারের প্যাকেটজাত খাবারের বদলে ঘরে তৈরি খাবার প্রস্তুত করা। বুটের ডাল, পেঁয়াজু, বেগুনি বা ঘরে তৈরি শরবত সহজে তৈরি করা যায় এবং খরচে উল্লেখযোগ্য সাশ্রয় হয়। একবারে বড় পরিমাণে মসলা প্রস্তুত করে ফ্রিজে সংরক্ষণ করলে রান্নার সময় ও গ্যাসের ব্যবহার দুটোই কমে যায়।
এছাড়া, পানীয়ের ক্ষেত্রে জুস বা সফট ড্রিঙ্কের বদলে পানি বা ঘরে তৈরি লেবু শরবত বেছে নিলে ব্যয় কমে এবং অতিরিক্ত চিনি গ্রহণের ঝুঁকি দূর হয়। বাইরে যাওয়ার সময় একটি বোতল পানি সঙ্গে রাখলে বিক্রেতার কাছ থেকে অতিরিক্ত পানীয় কেনার প্রয়োজন নেই, ফলে ছোটখাটো খরচও সাশ্রয় হয়।
পঞ্চম এবং শেষ কৌশল হল মাংসের বিকল্প বিবেচনা করা। গরু বা খাসির মাংসের বদলে মুরগি, ডিম, ডাল, সবজি বা ছোট মাছ ব্যবহার করলে প্রোটিনের চাহিদা পূরণ হয় এবং ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। পুষ্টিবিদরা উল্লেখ করেন, বৈচিত্র্যময় খাবার তালিকা স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সহায়ক, তবে মাংসের পরিমাণ সীমিত করলে ক্যালোরি ও চর্বি গ্রহণ নিয়ন্ত্রণে থাকে।
সামগ্রিকভাবে, রোজা মাসে সঠিক পরিকল্পনা, মৌসুমি পণ্য ব্যবহার, ঘরে রান্না এবং মাংসের বিকল্প গ্রহণের মাধ্যমে ব্যয় কমানো সম্ভব, পাশাপাশি পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ নিশ্চিত করা যায়। এই পদ্ধতিগুলো কেবল আর্থিক সাশ্রয়ই নয়, রোজা পালনকালে শরীরের স্বাস্থ্যেরও রক্ষা করে।
আপনার পরিবারে রোজা চলাকালীন কোন কৌশলগুলো সবচেয়ে কার্যকর হয়েছে? মন্তব্যে শেয়ার করুন, যাতে অন্যদেরও সহায়তা করা যায়।



