জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ হ্রাসের ফলে দেশজুড়ে শিল্পখাতে উৎপাদন বন্ধের ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। দুইটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটির রক্ষণাবেক্ষণ কাজের কারণে সরবরাহ প্রায় অর্ধেক কমে গেছে। এই পরিস্থিতি ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যখন গ্যাসের দৈনিক প্রবাহ ২,২৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসে।
টেক্সটাইল, গার্মেন্টস, সিরামিক ও স্টিলসহ বেশ কয়েকটি উৎপাদনমুখী শিল্পে কাজের থামা বা হ্রাসের প্রতিবেদন পাওয়া যাচ্ছে। গ্যাসের ঘাটতি সরাসরি উৎপাদন লাইন বন্ধ করে দেয়, ফলে উৎপাদন ক্ষমতা কমে এবং কর্মসংস্থান হ্রাস পায়। একই সঙ্গে, রপ্তানির সময়সীমা মেনে চলতে না পারার ফলে বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে চুক্তি রদ বা বিলম্বের ঝুঁকি বাড়ছে।
গ্যাস সরবরাহের সমস্যার মূল কারণ কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটির রক্ষণাবেক্ষণ। পেট্রোবাংলা ও তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সূত্রে জানা যায়, এই দুই টার্মিনালের মোট ক্ষমতা এক হাজার একশ মিলিয়ন ঘনফুট। উভয় টার্মিনাল সক্রিয় থাকলে দৈনিক গড়ে সাড়ে ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস গ্রিডে যোগ হয়, কিন্তু বর্তমানে সরবরাহ মাত্র সাড়ে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি।
দেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় চার হাজার দুইশ মিলিয়ন ঘনফুট। স্বাভাবিক অবস্থায় সরবরাহ প্রায় দুই হাজার আটশ থেকে তিন হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের মধ্যে থাকে। তবে ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে সরবরাহ মাত্র দুই হাজার দুইশ পঞ্চাশ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসে, ফলে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে প্রায় এক হাজার নয়শ পঞ্চাশ মিলিয়ন ঘনফুটের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই ঘাটতি শিল্পখাতে গ্যাসের চাপ কমিয়ে দেয় এবং উৎপাদন লাইন বন্ধের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
গ্যাসের ঘাটতির ফলে উৎপাদন হ্রাসের পাশাপাশি বিনিয়োগের পরিকল্পনাও প্রভাবিত হচ্ছে। বহু শিল্প প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা জানিয়েছে, গ্যাসের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় নতুন প্রকল্পের অর্থায়ন স্থগিত বা পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে। কর্মসংস্থানেও প্রভাব পড়ছে; উৎপাদন কমে যাওয়ায় শ্রমিকদের কাজের সময় কমে এবং বেকারত্বের ঝুঁকি বাড়ছে।
রপ্তানি ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি অনুকূল নয়। গ্যাসের ঘাটতি সত্ত্বেও রপ্তানির চাহিদা বজায় থাকলেও, অনেক রপ্তানিকারক নতুন অর্ডার গ্রহণ বন্ধ বা হ্রাস করেছে। ফলে দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয় হ্রাসের মুখে রয়েছে, যা বাণিজ্য ঘাটতি বাড়াতে পারে।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির অপারেশন ডিভিশনের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান জানিয়েছেন, রক্ষণাবেক্ষণাধীন টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ পুনরায় চালু হয়েছে, তবে পূর্ণ প্রভাব দেখতে প্রায় একদিন সময় লাগবে। তিনি উল্লেখ করেছেন, আজ রাত বারোটা পর্যন্ত গ্যাসের চাপ ও প্রবাহের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হবে এবং ধীরে ধীরে চাপ বাড়ানোর কাজ চলছে।
গ্যাসের চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিল্পখাতে উৎপাদন পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তবে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে শিল্পখাতের ব্যবস্থাপনা গ্যাসের বিকল্প জ্বালানি অনুসন্ধান এবং শক্তি সাশ্রয়ের পরিকল্পনা ত্বরান্বিত করছে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, যদি রক্ষণাবেক্ষণ কাজের সময়সীমা বাড়ে বা অতিরিক্ত টার্মিনাল বন্ধ হয়, তবে গ্যাসের ঘাটতি আরও গভীর হতে পারে এবং রপ্তানি ও বিনিয়োগে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়তে পারে। তাই সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার দ্রুত পদক্ষেপ এবং বিকল্প জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা দেশের শিল্পখাতের স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য অপরিহার্য।



