১৯৯৫-৯৬ সালের তাইওয়ান সংকটের পর থেকে চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পর্কের গতিপথে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছে। চীন দীর্ঘমেয়াদী কৌশল গড়ে তুলেছে যাতে মার্কিন ক্যারিয়ার জাহাজগুলোকে দূর থেকে পর্যবেক্ষণ ও নিরুৎসাহিত করা যায়। এই নীতি প্রশান্ত মহাসাগরে দুই দেশের নৌ-শক্তির ভারসাম্যকে পুনর্গঠন করছে।
১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী ক্যারিয়ারগুলো তাইওয়ানের নিকটবর্তী জলে স্বাধীনভাবে চলাচল করছিল। চীনের তখনকার সামরিক সক্ষমতা সেই জাহাজগুলোকে সনাক্ত বা বাধা দেওয়ার পর্যাপ্ত প্রযুক্তি থেকে বঞ্চিত ছিল। ফলে মার্কিন নৌবাহিনীর একতরফা আধিপত্য চীনের জন্য কূটনৈতিক এবং সামরিক উভয় দিকেই অস্বস্তিকর হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
এই অভিজ্ঞতা চীনের সামরিক আধুনিকায়নের জন্য একটি প্রেরণা হিসেবে কাজ করে। পরবর্তী দশকগুলোতে বেইজিং একটি ব্যাপক রূপান্তরের পরিকল্পনা গ্রহণ করে, যার লক্ষ্য ছিল মার্কিন ক্যারিয়ারের অবস্থান সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য চীন মহাকাশভিত্তিক নজরদারি উপগ্রহ, ওভার-দ্য-হরাইজন রাডার এবং স্বয়ংক্রিয় ড্রোনের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে।
উন্নত উপগ্রহ সিস্টেমের মাধ্যমে পৃথিবীর কক্ষপথ থেকে বিশাল সমুদ্রের ওপর ধারাবাহিক ছবি তোলা সম্ভব হয়েছে। ওভার-দ্য-হরাইজন রাডার সিগন্যালকে হরাইজনের বাইরে থেকে প্রতিফলিত করে দূরবর্তী জাহাজের গতিপথ নির্ণয় করে। ড্রোনগুলো সমুদ্রের ওপর দীর্ঘ সময় ধরে ঘুরে মার্কিন নৌবাহিনীর চলাচল রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করে। এই প্রযুক্তিগুলোর সমন্বয়ে চীন এখন মার্কিন ফ্লিটের ওপর অবিচ্ছিন্ন নজরদারি চালাতে সক্ষম।
কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে চীনের পরিকল্পনাকারীরা বুঝতে পেরেছেন যে শুধুমাত্র শত্রুর বিমান ধ্বংস করা যথেষ্ট নয়। ক্যারিয়ার জাহাজের কার্যক্ষমতা বজায় থাকলে নতুন বিমান উড়ে ওঠে, ফলে শত্রু শক্তি পুনরায় গঠন হয়। তাই চীন তার বিনিয়োগের বড় অংশকে দীর্ঘপরিসরের জাহাজ-বিধ্বংসী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের উন্নয়নে স্থানান্তরিত করেছে।
এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে ‘অ্যান্টি-শিপ ব্যালিস্টিক মিসাইল’ (ASBM) বলা হয় এবং তাদের পরিসর কয়েকশো মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত। উচ্চ গতি ও সুনির্দিষ্ট গাইডেন্স সিস্টেমের মাধ্যমে তারা ক্যারিয়ার জাহাজের নেভিগেশন সিস্টেমকে ব্যাহত করতে পারে। ফলে মার্কিন ক্যারিয়ারগুলোকে তাদের কার্যকরী পরিসীমা থেকে দূরে সরে যেতে বাধ্য করা হয়।
মার্কিন সুপারক্যারিয়ারগুলো যুদ্ধক্ষেত্রের নিকটবর্তী থাকলে তাদের বিমানবাহী ক্ষমতা সর্বোচ্চ হয়। তবে চীনের ASBM দ্বারা সৃষ্ট হুমকি তাদেরকে কয়েকশো মাইল পিছিয়ে রাখতে বাধ্য করে। এই দূরত্বের ফলে ক্যারিয়ারের আক্রমণ ক্ষমতা প্রায় অর্ধেকের বেশি হ্রাস পায়, কারণ বিমানগুলোকে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয় এবং জ্বালানি খরচ বাড়ে।
দূরত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জাহাজের জ্বালানি পুনরায় পূরণ বা রিফুয়েলিংয়ের জটিলতা বৃদ্ধি পায়। বারবার রিফুয়েলিং অপারেশন নৌবাহিনীর লজিস্টিক ব্যয় বাড়ায় এবং বিমানবাহী শক্তির ধারাবাহিকতা কমিয়ে দেয়। এই পরিস্থিতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক সামরিক প্রভাবকে দুর্বল করতে পারে, বিশেষ করে দ্রুত প্রতিক্রিয়া প্রয়োজনীয় সংকটে।
কৌশলগতভাবে চীনের এই পদক্ষেপের পেছনে একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও রয়েছে। যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বড় ক্যারিয়ার জাহাজকে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়, তবে তা দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক আলোচনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। এই ধরনের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি মার্কিন নীতিনির্ধারকদের সংকট মোকাবিলায় দ্বিধা বাড়াতে পারে।
অতএব, চীন দীর্ঘপরিসরের ক্ষেপণাস্ত্র এবং উন্নত নজরদারি ব্যবস্থা ব্যবহার করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার লক্ষ্য রাখে। ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তিগুলোর পরিসর ও নির্ভুলতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন ক্যারিয়ার জাহাজের অপারেশনাল স্বায়ত্তশাসন আরও সীমাবদ্ধ হতে পারে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে চীন তার ASBM প্রোগ্রামকে আরও উন্নত করে এবং অতিরিক্ত সেন্সর নেটওয়ার্ক যুক্ত করে সামুদ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোকে শক্তিশালী করবে। এ ধরনের উন্নয়ন প্রশান্ত মহাসাগরে সামরিক ভারসাম্যের পুনর্গঠনকে ত্বরান্বিত করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-শক্তির কৌশলগত অবস্থানকে পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করবে।
সারসংক্ষেপে, ১৯৯৫-৯৬ সালের তাইওয়ান সংকটের পর চীন যে সামরিক রূপান্তর গৃহীত করেছে, তা এখন দীর্ঘপরিসরের ক্ষেপণাস্ত্র এবং সর্বাত্মক নজরদারি প্রযুক্তির মাধ্যমে মার্কিন ক্যারিয়ার জাহাজের কার্যক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করার দিকে অগ্রসর হয়েছে। এই কৌশল কেবল সামরিক ক্ষেত্রেই নয়, রাজনৈতিক স্তরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতিপথকেও প্রভাবিত করতে সক্ষম।



