রাজিয়া বিবি, যিনি প্রায় চার দশক আগে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানের করাচিতে পাচার হয়ে পাঞ্জাবের কাসুর জেলার পাতকি শহরের নিকটবর্তী গ্রামে বসবাস করছেন, বর্তমানে তার মাতার অবস্থা ও নিজের দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতার কারণে বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার অনুমতি চাচ্ছেন। তিনি দাবি করছেন যে, পাসপোর্ট, ভিসা এবং টিকিটসহ সব প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পূর্ণ বৈধ ছিল, তবু পাকিস্তানের ইমিগ্রেশন বিভাগ তাকে বিমানবন্দরে আটকে দেয়।
রাজিয়ার জন্ম বাংলাদেশে, এবং ১৮ বছর বয়সে তিনি একটি কারখানার সহকর্মীর মাধ্যমে সোনার ব্যবসার নামে করাচিতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে পাঁচ হাজার রুপির বিনিময়ে একটি প্রতিবন্ধী ছেলের সঙ্গে বিবাহের জন্য বিক্রি করা হয়। এরপর তিনি পাতকির একটি গ্রামে বসে গিয়ে ছাগল ও মুরগি পালন করে নিজের জীবিকা চালিয়ে যাচ্ছেন।
বছরের পর বছর, রাজিয়া একবার দেশে ফেরার চেষ্টা করেন, কিন্তু বিমানবন্দরে তার যাত্রা থেমে যায়। তিনি বলেন, “আমি পাসপোর্ট করেছি, ভিসা করেছি এবং টিকিটও কিনেছি, কিন্তু যখন বিমানবন্দরে পৌঁছালাম, আমাকে আটকে দেওয়া হলো।” তার মা বর্তমানে অসুস্থ এবং মৃত্যুর কাছাকাছি, ফলে তিনি মা‑বোনের মুখ দেখার একবারের সুযোগও পেতে চান।
রাজিয়ার স্বামী মারা গেছেন, একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে এবং পরিবারে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বাড়িয়ে দিয়েছে। দুই বছর আগে স্থানীয় একজন ফার্মাসিস্ট তার পরিবারকে খুঁজে বের করতে সহায়তা করেন, যা তার প্রত্যাবর্তনের ইচ্ছাকে আরও দৃঢ় করে। তিনি গত চৌদ্দ বছর ধরে ছাগল ও মুরগি পালন করে সঞ্চয় করে রেখেছেন, যাতে যথেষ্ট অর্থ সংগ্রহ করে দেশে ফিরে যেতে পারেন।
রাজিয়া বর্তমানে পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মরিয়াম নওয়াজের হস্তক্ষেপের আবেদন করেছেন। তিনি আশাবাদী যে, রাজ্যের শীর্ষ কর্মকর্তারা তার কষ্ট বুঝে তাকে পরিবারে পুনর্মিলনের সুযোগ দেবেন। তার দাবি অনুযায়ী, সকল কাগজপত্র বৈধ, তাই কোনো আইনি বাধা নেই।
এই ঘটনার আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটকে বিবেচনা করলে, মানব পাচার একটি গ্লোবাল চ্যালেঞ্জ হিসেবে স্বীকৃত। জাতিসংঘের মানব পাচার বিরোধী কনভেনশন অনুযায়ী, পাচার শিকারদের পুনর্বাসন ও পরিবারে পুনর্মিলনকে অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ও পাকিস্তান সরকার উভয়ই এই চুক্তির অধীনে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, দক্ষিণ এশিয়ার সীমান্তে মানব পাচার নেটওয়ার্কের বিস্তার দেশীয় ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নীতির ওপর প্রভাব ফেলছে। “এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদী বিচ্ছিন্নতা কেবল ব্যক্তিগত কষ্টই নয়, দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের সেতুতে চাপ সৃষ্টি করে,” একজন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ বলেন। তিনি যুক্তি দেন, যে কোনো শিকারকে দ্রুত তার মূল দেশে ফিরিয়ে দেওয়া উভয় দেশের মানবিক দায়িত্বের অংশ।
বাংলাদেশ সরকারও এই ধরনের মামলায় সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। যদিও সরাসরি কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি, তবে সরকার সাধারণত নাগরিকদের বিদেশে আটক হলে কূটনৈতিক সুরক্ষা প্রদান করে থাকে। একই সঙ্গে, পাকিস্তান সরকারকে আন্তর্জাতিক মানবিক মানদণ্ড মেনে শিকারের অধিকার রক্ষা করতে বলা হচ্ছে।
রাজিয়ার মামলা বর্তমানে পাকিস্তানের আদালতে চলমান, যেখানে তিনি তার পুনর্বাসনের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। যদি আদালত তার পক্ষে রায় দেয়, তবে তা মানব পাচার শিকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি পূর্বদৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
অঞ্চলীয় পর্যায়ে, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ উভয়ই মানব পাচার মোকাবিলায় যৌথ প্রশিক্ষণ ও তথ্য শেয়ারিং প্রোগ্রাম চালু করার পরিকল্পনা করেছে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হল সীমান্ত পারাপার নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করা এবং শিকারের দ্রুত পুনর্বাসন নিশ্চিত করা।
রাজিয়ার গল্পটি মানব পাচারের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবের একটি উদাহরণ, যেখানে শিকারের জীবনের গতি, পরিবারিক বন্ধন এবং আইনি অধিকার সবই একসাথে জড়িয়ে আছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন ও দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ছাড়া এই ধরনের কেসে সমাধান পাওয়া কঠিন।
রাজিয়া শেষ পর্যন্ত তার মাতার মুখ দেখতে এবং পরিবারে পুনর্মিলন করতে পারলে, তা তার জন্যই নয়, মানব পাচার শিকারের জন্যও একটি আশার আলো হয়ে উঠবে। তার কেসের ফলাফল ভবিষ্যতে একই রকম শিকারের জন্য নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।



