প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস, দেশের প্রধান উপদেষ্টা, ১৬ ফেব্রুয়ারি সোমবার রাতের জাতীয় ভাষণে নির্বাচনের ফলাফল ও গণতন্ত্রের মূল্য নিয়ে মন্তব্য করেন। তিনি জাতির সামনে দাঁড়িয়ে বিজয়ী ও পরাজিত উভয় প্রার্থীর প্রতি সমান শুভেচ্ছা জানিয়ে, নির্বাচনের শান্তিপূর্ণ পরিবেশকে প্রশংসা করেন।
বিজয়ী প্রার্থীদের জন্য তিনি অভিনন্দন জানিয়ে, তাদের ভোটের অর্ধেকের কাছাকাছি সমর্থন পেয়েছেন বলে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে, যারা নির্বাচনে সফল হননি, তাদেরও ভোটের প্রায় অর্ধেকই সমর্থন করেছে বলে স্বীকার করে, দু’পক্ষের অংশগ্রহণকে গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেন।
ইউনূস ‘হার-জিতই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য’ কথাটি ব্যবহার করে, ভোটারদের সমগ্র অংশগ্রহণের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, পরাজিত প্রার্থীরা জানবেন যে প্রায় অর্ধেক ভোটার তাদের ওপর আস্থা রেখেছে, যা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সংলাপের ভিত্তি হবে।
বর্ণনা অনুযায়ী, বিজয়ী দল মোট ভোটের প্রায় ৫০ শতাংশ পেয়েছে, আর অবশিষ্ট প্রায় ৫০ শতাংশ ভোট অন্য প্রার্থীর পক্ষে গিয়েছে। এই সমান ভাগাভাগি ভোটারদের সমন্বিত ইচ্ছাকে প্রতিফলিত করে, যা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে শক্তিশালী করে।
প্রধান উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, নতুন সরকার শীঘ্রই দায়িত্ব গ্রহণ করবে এবং এর মাধ্যমে বর্তমান ১৮ মাসের অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব শেষ হবে। তিনি এই পরিবর্তনকে দেশের শাসন ব্যবস্থার স্বাভাবিক প্রবাহের অংশ হিসেবে বর্ণনা করেন।
ইউনূস ১৭ বছর পর অনুষ্ঠিত এই জাতীয় নির্বাচনের জন্য সকল নাগরিককে শুভেচ্ছা জানিয়ে, এর উৎসবমুখর, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ বৈশিষ্ট্যকে প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, এই নির্বাচন দেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সাফল্যকে প্রমাণ করে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ভোটার, রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, নির্বাচন সংস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত প্রচেষ্টা এই সফলতা অর্জনে মূল ভূমিকা পালন করেছে। সকল অংশগ্রহণকারীকে সম্মিলিতভাবে একটি প্রশংসনীয় নজির তৈরি করার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে, ভবিষ্যৎ নির্বাচনের মানদণ্ড নির্ধারণে এই উদাহরণকে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করার আহ্বান জানান।
ভবিষ্যৎ নির্বাচন কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে তিনি বলেন, এই নির্বাচন তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে থাকবে এবং দেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধ করবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, পরবর্তী নির্বাচনে একই রকম স্বচ্ছতা ও শান্তি বজায় থাকবে।
বিদায়ের মুহূর্তে, ইউনূস ৫ আগস্টের মুক্তিযুদ্ধের বিজয় দিবসের কথা স্মরণ করে, দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তির আনন্দের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ঐ দিনটি জাতির জন্য এক বিশাল আনন্দের মুহূর্ত, যখন বিদেশে ও দেশে সকল বাংলাদেশি আনন্দে চোখের পানি ফেলেছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের পর দেশের অচল অবস্থা থেকে পুনরুজ্জীবনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তিনি আলোচনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, তরুণ ছাত্র-ছাত্রীরা দেশের স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং দেশের পুনর্গঠনে নেতৃত্ব দিয়েছে।
সেই সময়ের ছাত্রনেতারা একটি কার্যকর সরকার গঠনের জন্য তাকে আহ্বান জানায়, যদিও তিনি তখন বিদেশে ছিলেন এবং দায়িত্ব গ্রহণে অনিচ্ছুক ছিলেন। তবে জাতির প্রতি দায়িত্ববোধের কথা শোনার পর তিনি শেষ পর্যন্ত দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এখন ১৮ মাসের কাজ শেষ হয়ে, তিনি সরকার থেকে বিদায় নিতে প্রস্তুত।
ইউনূস শেষ করে বলেন, তার প্রথম কাজ ছিল দেশের কার্যকরী অবস্থা পুনরুদ্ধার করা, যা তিনি সবচেয়ে কঠিন কাজ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি স্বীকার করেন, পূর্বে দেশের সম্পদ লুটে নেওয়া গোষ্ঠীই দেশের যন্ত্র চালাতো, তাই তার দায়িত্ব ছিল সেসব গোষ্ঠীর প্রভাব দূর করে দেশকে সচল করা।
আজকের ভাষণে তিনি দেশের সকল নাগরিককে ভবিষ্যতে শান্তিপূর্ণ ও ন্যায়সঙ্গত শাসনের জন্য একসাথে কাজ করার আহ্বান জানান এবং নতুন নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য শুভেচ্ছা প্রকাশ করেন।



