গুলশানের দলীয় কার্যালয়ে একান্ত সাক্ষাৎকারে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বললেন, বাংলাদেশে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলো দ্রুত অগ্রসর করা হবে এবং ভারত‑বাংলাদেশের অংশীদারিত্বকে শক্তিশালী করা হবে। একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে উল্লেখ করলেন, শেখ হাসিনা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য শাস্তি পাওয়ার দাবী রয়েছে এবং তাকে ভারতের কাছে হস্তান্তর করা উচিত। তবে ভারত যদি এই প্রত্যর্পণ না করে তবুও বাণিজ্যিক ও অন্যান্য ক্ষেত্রের সম্পর্কের কোনো বাধা হবে না বলে তিনি আশ্বাস দিলেন।
মির্জা ফখরুলের মতে, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে একক ইস্যুতে ‘বন্দী’ করা উচিত নয়; বৃহত্তর সহযোগিতার জন্য উভয় দেশকে বহু দিক থেকে কাজ করতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে বাংলাদেশ বারবার ভারতকে শেখ হাসিনা ও ২০২৪ সালের গণ‑অভ্যুত্থানের পর পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগ জ্যেষ্ঠ নেতাদের প্রত্যর্পণ চেয়েছে, কিন্তু গত ১৭ মাসে ভারত থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
শেখ হাসিনা ও তার মন্ত্রিসভা, পাশাপাশি তার পারিবারিক সদস্যদের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ড ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে; এই বিষয়ে আইনগত প্রক্রিয়া চলছে এবং তা চলতে থাকবে, মির্জা ফখরুল জোর দিয়ে বললেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, হালদা জিয়া, যিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন, গ্রেপ্তার হওয়ার পর দলের স্থায়ী কমিটির নেতৃত্বে তিনি ছিলেন, তখন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যুক্তরাজ্যে নির্বাসনে ছিলেন।
বিএনপি মহাসচিব ভারত‑বাংলাদেশ সম্পর্কের জটিলতা স্বীকার করে, তবে তা সহযোগিতার ক্ষেত্রকে সীমাবদ্ধ করা উচিত নয় বলে মন্তব্য করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বিদ্যমান সমস্যার উদাহরণ দিয়ে বলেন, তবুও উভয় দেশ একে অপরের সঙ্গে কাজ করে চলেছে; একইভাবে ভারত‑বাংলাদেশ সম্পর্কেও একাধিক ইস্যুতে আটকে না থেকে সামগ্রিক উন্নয়নের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
ইতিহাসের দিক থেকে মির্জা ফখরুল ১৯৭৫ সালের আগস্টে শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার পর, যখন শেখ হাসিনা ও তার পরিবার ভারতেই ছিলেন, তখন বিএনপি প্রতিষ্ঠাতা ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভারত সফরের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি জানান, জিয়াউর রহমান তখন ঢাকায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাইকে আতিথ্য প্রদান করেন এবং ১৯৮০ সালের জানুয়ারিতে দিল্লি সফরে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেই সময়ে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন।
মির্জা ফখরুলের মন্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, বাংলাদেশ‑ভারত প্রকল্পের দ্রুত অগ্রগতি ও উন্নয়ন অংশীদারিত্বের জোরদারকরণই বর্তমান অগ্রাধিকার। তিনি বলেন, এই প্রকল্পগুলোতে জ্বালানি, অবকাঠামো ও বাণিজ্যিক সংযোগের উন্নতি অন্তর্ভুক্ত, যা উভয় দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ।
অন্তর্বর্তী সরকারের ভারতকে করা প্রত্যর্পণ অনুরোধের কোনো সাড়া না পাওয়া সত্ত্বেও, মির্জা ফখরুল আশাবাদী যে ভবিষ্যতে উভয় দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান বের হবে। তিনি উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়া উচিত, তবে তা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সামগ্রিক উন্নয়নে বাধা না হয়ে কাজ করবে।
বিএনপি মহাসচিবের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারত‑বাংলাদেশের কূটনৈতিক সংলাপকে বিস্তৃত বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে চালিয়ে যাওয়া জরুরি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, একক ইস্যুতে সম্পর্ককে সীমাবদ্ধ না করে, নিরাপত্তা, বাণিজ্য, জ্বালানি ও মানবিক সহযোগিতা সহ বহু ক্ষেত্রে সমন্বয় বাড়ানো দরকার।
শেখ হাসিনার মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ভিত্তিতে ভারতকে প্রত্যর্পণ চাওয়া, মির্জা ফখরুলের মতে, আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার একটি পদক্ষেপ। তবে তিনি স্বীকার করেন, এই দাবি পূরণে ভারতীয় সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীলতা রয়েছে এবং তা স্বল্পমেয়াদে বাস্তবায়িত হবে কিনা তা অনিশ্চিত।
বিএনপি মহাসচিবের শেষ মন্তব্যে তিনি বললেন, “আমেরিকা ও চীনের মধ্যে অনেক সমস্যা আছে, তবু তারা একে অপরের সঙ্গে কাজ করছে। ভারত‑বাংলাদেশ সম্পর্কেও আমরা একটি ইস্যুতে আটকে থাকতে পারি না।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি বহুমুখী কূটনৈতিক নীতি অনুসরণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন।
সারসংক্ষেপে, মির্জা ফখরুলের গুলশান সাক্ষাৎকারে ভারতকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ দাবি, পাশাপাশি বাংলাদেশ‑ভারত প্রকল্পের ত্বরান্বিত বাস্তবায়ন ও উন্নয়ন অংশীদারিত্বের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, একক ইস্যুতে সম্পর্ককে সীমাবদ্ধ না করে, উভয় দেশের দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থে সমন্বিত কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।



