বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের কল্যাণ কাউন্সিলের প্রতিবাদের ফলে ডিজিটাল ব্যাংক লাইসেন্সের অনুমোদন প্রক্রিয়া আজ সকাল থেকে স্থবির অবস্থায় রয়েছে। কাউন্সিলের সদস্যরা জরুরি পর্ষদ সভা স্থগিতের দাবি জানিয়ে, লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্ব রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন।
সকালবেলা কাউন্সিলের নেতৃত্বাধীন একটি সংবাদ সম্মেলনে তারা পর্ষদ সভা বাতিলের দাবি পুনরায় তুলে ধরেন। তবে একই দিনে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভা অনুষ্ঠিত হয়, যদিও মূল এজেন্ডা ছিল ডিজিটাল ব্যাংক অনুমোদন। সভার শেষ মুহূর্তে এজেন্ডা পরিবর্তন করে আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নম্বর তালিকা জানানো হয়, ফলে লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়া অগ্রসর হয়নি।
বিকেলে পর্ষদ সভা শেষ হওয়ার পরও কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি, ফলে ডিজিটাল ব্যাংক লাইসেন্সের অনুমোদন আটকে থাকে। এই পরিস্থিতি ব্যাংকের অভ্যন্তরে এবং বাজারে উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে। সকালেই কর্মকর্তাদের কল্যাণ কাউন্সিলের সংবাদ সম্মেলনের পর বিকেলে ব্যাংক একটি আদেশ জারি করে, যেখানে অনুমোদন ছাড়া কোনো কর্মচারী ব্যক্তিগতভাবে, ঘরোয়া বৈঠকে বা জনসাধারণের সামনে ব্যাংক সংক্রান্ত বক্তব্য দিতে পারবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান প্রথম আলোকে জানিয়ে বলেন, জরুরি পর্ষদ সভায় ডিজিটাল ব্যাংকের অগ্রগতি সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়েছে, তবে তা নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তিনি উল্লেখ করেন, পর্ষদ সদস্যদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলমান।
কাউন্সিলের মুখপাত্র উল্লেখ করেন, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর, নবনির্বাচিত প্রতিনিধিদের শপথ এবং সরকার গঠনের প্রক্রিয়া চলাকালীন, এক দিনের নোটিশে ১৬ ফেব্রুয়ারি জরুরি পর্ষদ সভা ডাকা হয়। এই সময়সূচি স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্বের নীতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
কাউন্সিলের মতে, এই জরুরি সভার মূল উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীকে ডিজিটাল ব্যাংক লাইসেন্স প্রদান করা, যা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। তারা উল্লেখ করেন, বর্তমান গভর্নর অতীতে সেই গোষ্ঠীর একটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন, ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়।
অধিকন্তু, কাউন্সিলের দাবি যে গভর্নরের ঘনিষ্ঠ পরিচয়ের মাধ্যমে অযোগ্য ব্যক্তিদের পরামর্শক ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যুক্ত করা হয়েছে, তা নিয়মের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তারা উল্লেখ করেন, বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া বহিরাগত ব্যক্তিকে কার্ড ইস্যু এবং গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া অনন্য এবং অনিয়মিত।
কাউন্সিলের একটি বিবৃতিতে ব্যাংক কোম্পানি আইনের ধারাগুলি উল্লেখ করে বলা হয়েছে, যে কোনো অনুমোদনবিহীন কর্ম বা সিদ্ধান্ত আইনগতভাবে অবৈধ। তারা ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা ও নীতিমালার সঠিক প্রয়োগের দাবি তুলে ধরেন।
ডিজিটাল ব্যাংক লাইসেন্সের বিলম্বের ফলে দেশের ফিনটেক খাতের উন্নয়ন পরিকল্পনায় প্রভাব পড়তে পারে। সম্ভাব্য নতুন ডিজিটাল ব্যাংকগুলো বাজারে প্রবেশের জন্য অপেক্ষা করতে বাধ্য, যা বিনিয়োগকারী ও স্টার্টআপের আস্থা কমিয়ে দিতে পারে।
বাজার বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দেন, যদি স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্বের প্রশ্ন সমাধান না হয়, তবে ভবিষ্যতে অন্যান্য ডিজিটাল ব্যাংক লাইসেন্সের আবেদনেও অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে। এটি আর্থিক খাতের উদ্ভাবনী প্রকল্পের জন্য ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলবে।
অন্যদিকে, ব্যাংকের অভ্যন্তরে কর্মচারীদের প্রকাশনা সীমাবদ্ধ করার আদেশের ফলে তথ্যের প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। স্বতন্ত্র বিশ্লেষক ও গবেষকদের মতামত প্রকাশে বাধা আর্থিক নীতি সম্পর্কে জনসাধারণের সচেতনতা কমিয়ে দিতে পারে।
কাউন্সিলের নেতৃত্বাধীন কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করেছেন, দ্রুত একটি স্বচ্ছ ও ন্যায়সঙ্গত প্রক্রিয়া গড়ে তোলা হবে, যাতে ডিজিটাল ব্যাংক লাইসেন্সের আবেদনকারী সকলের সমান সুযোগ পায়। তারা উল্লেখ করেন, ভবিষ্যতে এমন জরুরি সভা না করে যথাযথ নোটিশ ও আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
বর্তমানে ডিজিটাল ব্যাংক লাইসেন্সের অনুমোদন এখনও অনির্ধারিত রয়েছে। পর্ষদকে অনুরোধ করা হচ্ছে, প্রাসঙ্গিক সকল তথ্য ও বিশ্লেষণ উপস্থাপন করে, স্বচ্ছতা বজায় রেখে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া। এই বিষয়টি সমাধান না হলে আর্থিক খাতের উন্নয়ন ও বিনিয়োগের পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়তে পারে।



