চীন সরকার সর্বনিম্ন জন্মহার রেকর্ড করেছে, ফলে শ্রমশক্তি সংকুচিত হচ্ছে এবং প্রবীণ জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই জনতাত্ত্বিক পরিবর্তন দেশের উৎপাদন ও ভোগের গতি পরিবর্তনের ঝুঁকি তৈরি করছে, যা নিকট ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক গতি হ্রাসের সম্ভাবনা নির্দেশ করে।
জাতীয় পরিসংখ্যান অনুসারে, জন্মহার ঐতিহাসিক নিম্ন স্তরে নেমে এসেছে, ফলে কর্মক্ষম বয়সের জনগোষ্ঠী হ্রাস পাচ্ছে। একই সঙ্গে, ৬০ বছরের উপরে প্রবীণদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, যা পেনশন ও স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা বাড়িয়ে তুলবে।
চীন সরকার নগদ সহায়তা, কর ছাড় এবং বিবাহ সহজ করার মতো নীতি চালু করেও জন্মহারের পতন থামাতে পারেনি। এই নীতিগুলি স্বল্পমেয়াদে কিছু আর্থিক স্বস্তি দিলেও, দীর্ঘমেয়াদে জনসংখ্যা হ্রাসের প্রবণতা পরিবর্তন করতে ব্যর্থ হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট সি জিনপিং বছরের পর বছর ধরে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে স্বয়ংক্রিয়তা ও উচ্চপ্রযুক্তি রূপান্তরের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তার দৃষ্টিভঙ্গি চীনকে স্বনির্ভর উচ্চপ্রযুক্তি শক্তিতে রূপান্তর করা, যাতে শ্রম ঘাটতি পূরণে রোবট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা যায়।
জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞ স্টুয়ার্ট গি টেল বাস্টেনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যদি বর্তমান প্রবণতা ২০‑৩০ বছর ধরে বজায় থাকে, তবে শ্রমশক্তি ও বয়স্ক জনসংখ্যার মধ্যে বড় পার্থক্য সৃষ্টি হবে, যা অর্থনৈতিক সংকটের ঝুঁকি বাড়াবে। তিনি উল্লেখ করেন যে স্বয়ংক্রিয়তা ও এআই সঠিকভাবে প্রয়োগ করলে এই চ্যালেঞ্জ কমানো সম্ভব।
ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রোবোটিকসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী স্থাপিত রোবটের অর্ধেকেরও বেশি চীনে বসেছে, যা এটিকে বিশ্বের বৃহত্তম শিল্প রোবট বাজার করে তুলেছে। এই পরিসংখ্যান চীনের রোবোটিক্স উৎপাদন ও ব্যবহার ক্ষেত্রে আধিপত্যকে স্পষ্ট করে।
চীনা কারখানাগুলোতে রোবোটিক বাহু দিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওয়েল্ডিং, পেইন্টিং এবং অ্যাসেম্বলি কাজ সম্পন্ন করা হয়। কিছু কারখানা ‘ডার্ক ফ্যাক্টরি’ হিসেবে পরিচিত, যেখানে আলো ছাড়াই রোবটের কাজ চালানো হয়, ফলে শক্তি খরচ ও মানবিক ত্রুটি হ্রাস পায়।
বেইজিং বর্তমানে মানবসদৃশ হিউম্যানয়েড রোবটে বড় বিনিয়োগ করছে। সরকারী ভর্তুকি পেয়ে ১৪০টির বেশি কোম্পানি এই রোবটের উন্নয়নে কাজ করছে, এবং কিছু রোবট ইতিমধ্যে অ্যাসেম্বলি লাইন ও বৈজ্ঞানিক ল্যাবের পরীক্ষামূলক পর্যায়ে ব্যবহার করা হচ্ছে।
জাতিসংঘের পূর্বাভাস অনুসারে, ২১০০ সালের মধ্যে চীনের অর্ধেকের বেশি জনগণ ৬০ বছরের উপরে হবে। এই বিশাল প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সেবা নিশ্চিত করতে চীন হিউম্যানয়েড রোবট, ব্রেইন-কম্পিউটার ইন্টারফেস, এক্সোস্কেলেটন এবং মাসল স্যুটের উন্নয়নে জোর দিচ্ছে।
এক সন্তান নীতির দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবের ফলে বর্তমান তরুণ প্রজন্ম একাই পিতামাতার যত্ন নিতে বাধ্য, যা রোবট প্রযুক্তির চাহিদা বাড়িয়ে তুলেছে। পরিবারিক যত্নের ঘাটতি পূরণে স্বয়ংক্রিয় সেবা সমাধানকে কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চীন সরকারের পেনশন ব্যবস্থা ভবিষ্যতে আর্থিক ঘাটতির মুখে পড়তে পারে। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের বিশ্লেষক তিয়ানজেং জু উল্লেখ করেন, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন পেনশন ফান্ডের চাপ কমাতে এবং বয়স্কদের জীবনের মান উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সারসংক্ষেপে, চীন সরকার জনসংখ্যা হ্রাসের প্রভাব মোকাবেলায় রোবট ও অটোমেশনকে মূল কৌশল হিসেবে গ্রহণ করেছে। রোবোটিক্সের দ্রুত বিস্তার উৎপাদনশীলতা বজায় রাখতে এবং বৃদ্ধজনের যত্নে সহায়তা করতে পারে, তবে একই সঙ্গে শ্রমবাজারের কাঠামো ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুনর্গঠন প্রয়োজন। ভবিষ্যতে রোবট প্রযুক্তির গ্রহণযোগ্যতা ও নীতি সমন্বয়ই চীনের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নির্ধারণের মূল চাবিকাঠি হবে।



