ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর দেশব্যাপী সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) সোমবার প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে জানায় যে অন্তত বিশ ছয়টি জেলায় সংঘটিত ঘটনা ৭ জনের মৃত্যু এবং ৩৫০ জনের আঘাতের কারণ হয়েছে। এই তথ্যগুলো নির্বাচনের তিন দিন পর মিডিয়ায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং এমএসএফের পক্ষ থেকে তীব্র নিন্দা ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
এমএসএফের দাবি অনুযায়ী, সরকারকে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়িত্বশীল ও জরুরি পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানানো হয়েছে। সহিংসতার শিকারদের মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থক, রাজনৈতিক কর্মী, সাধারণ নাগরিক এবং শিশু অন্তর্ভুক্ত।
মুন্সিগঞ্জে জসিম উদ্দিন এবং বাগেরহাটে ওসমান সরদার স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থক হওয়ার কারণে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়। ময়মনসিংহে একটি শিশুকে তার পিতার স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মী হওয়ার কারণে সূপারির চুরির অপবাদ দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করার অভিযোগ উঠে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণে দুইজনের প্রাণ নেওয়া হয়েছে। ভোলায় আওয়ামী লীগের কর্মী আব্দুর রহিম গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। লক্ষ্মীপুরে রিকশা চালক মো. সোহাগ মিজি নির্বাচনের রাত থেকে নিখোঁজ ছিলেন; পরে পরিত্যক্ত বালুর মাঠে তার মৃতদেহ পাওয়া যায়।
সিরাজগঞ্জ সদর এলাকায় ভোটের পরই দিনমজুর আব্দুল মোতালেব কাজী গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আঘাত পেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এছাড়া, নোয়াখালীর হাতিয়ায় এক নারীর ধর্ষণের অভিযোগও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এমএসএফের তথ্য অনুযায়ী, ভোলা, নাটোর, কুষ্টিয়া, নড়াইল, গাজীপুর, যশোর, বরিশাল, পটুয়াখালী, নেত্রকোনা, কুমিল্লা, চাঁদপুর, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, ফরিদপুর, ঝিনাইদহ, শেরপুর, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী, গাইবান্ধা, বগুড়া, কুড়িগ্রাম, ময়মনসিংহ, পঞ্চগড়, নরসিংদী, লালমনিরহাট এবং ঢাকা কেরানীগঞ্জসহ বহু জেলায় রাজনৈতিক কর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষ আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। মোট সাড়ে তিনশো অধিক ব্যক্তি আহত হয়েছে বলে জানা যায়।
বহু রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যালয়, কর্মী-সমর্থকদের বাড়ি এবং নির্বাচনী ক্যাম্পে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। কিছু ক্ষেত্রে গুলিবিদ্ধের সঙ্গে সঙ্গে সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও নিরাপত্তা বাহিনী ঘটনাস্থলে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। গুলিবিদ্ধদের পরিচয় ও ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণের জন্য ফরেনসিক পরীক্ষা এবং সাক্ষী সংগ্রহ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট জেলায় পুলিশ ও তদন্তকারী সংস্থার দল গঠন করে প্রমাণ সংগ্রহের কাজ দ্রুততর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অধিকন্তু, মানবাধিকার সংগঠনগুলো আদালতে মামলা দায়েরের সম্ভাবনা প্রকাশ করেছে এবং ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য আইনি সহায়তা প্রদান করবে বলে জানিয়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলোকেও এ ধরনের সহিংসতা বন্ধে তৎপরতা দেখাতে এবং তাদের কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষ করে স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থক ও কর্মীদের ওপর লক্ষ্যভিত্তিক হামলা রোধে সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে।
এমএসএফের প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সহিংসতার মূল কারণ হিসেবে নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে অসন্তোষ, রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং কিছু ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থনকে কেন্দ্র করে গোষ্ঠীগত সংঘর্ষকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক ও পুলিশ কমিশনারকে ঘটনাস্থলে তৎক্ষণাৎ পদক্ষেপ নিতে এবং শিকারের পরিবারকে সহায়তা প্রদান করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা পুনরাবৃত্তি রোধে নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুনর্বিবেচনা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
এই সহিংসতার পরিপ্রেক্ষিতে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং প্রতিবেশী দেশের পর্যবেক্ষকগণও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
সামগ্রিকভাবে, দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে। এ ধরনের ঘটনা পুনরায় না ঘটার জন্য আইনগত, প্রশাসনিক এবং সামাজিক দিক থেকে সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছে।



