ইন্ডিয়ান মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী একটি তেলবাহী জাহাজ দখল করেছে। প্যানামা নিবন্ধিত ‘ভেরোনিকা-৩’ নামের জাহাজটি ভেনেজুয়েলা সরকার কর্তৃক মালিকানাধীন এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা কাঁচা তেল বহন করছিল। দখলটি ৩ জানুয়ারি ঘটেছে, যখন জাহাজটি ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে পালানোর চেষ্টা করছিল।
ইউএস পেন্টাগন জানিয়েছে, জাহাজটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত তেল অবরোধ অমান্য করে গোপনে সরে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। পেন্টাগন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত পোস্টে উল্লেখ করেছে, জাহাজটি মার্কিন অবরোধকে অমান্য করার লক্ষ্যে গতি বাড়িয়ে চলেছিল।
‘ভেরোনিকা-৩’ প্যানামা ফ্ল্যাগের অধীনে পরিচালিত হলেও, এর মালিকানা ভেনেজুয়েলা সরকারের সঙ্গে যুক্ত। জাহাজে আনুমানিক ২০ লাখ ব্যারেল কাঁচা তেল এবং ফুয়েল অয়েল ছিল, যা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত। ট্যাঙ্কারট্র্যাকার ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটি ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলা উপকূল থেকে রওনা হয়।
ভেনেজুয়েলা সরকার বহু বছর ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, দেশটি ‘শ্যাডো ফ্লিট’ নামে পরিচিত ছায়া নৌবহর ব্যবহার করে অবৈধভাবে কাঁচা তেল আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করে। এই নৌবহরগুলো প্রায়শই ভুয়া পতাকা ব্যবহার করে নজরদারি এড়িয়ে চলে।
ডিসেম্বরে ট্রাম্প প্রশাসন নিষেধাজ্ঞাভুক্ত ট্যাঙ্কারগুলোর ওপর কোয়ারেন্টাইন আরোপ করে অবরোধ ঘোষণা করে। এরপর জানুয়ারিতে মার্কিন বিশেষ বাহিনী ভেনেজুয়েলা প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে নিউইয়র্কে নিয়ে আসে, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বড় আলোড়ন সৃষ্টি করে।
মাদুরোর গ্রেফতারের পর ভেনেজুয়েলা উপকূলের বেশ কয়েকটি ট্যাঙ্কার দ্রুত পালিয়ে যায়। ‘ভেরোনিকা-৩’ একই দিনে রওনা হওয়া সত্ত্বেও, অন্যান্য জাহাজের তুলনায় বেশি সময় না নিয়ে আন্তর্জাতিক জলে প্রবেশ করে। এই ঘটনাটি ভেনেজুয়েলা তেল রপ্তানির ওপর নতুন সীমাবদ্ধতা আরোপের ইঙ্গিত দেয়।
ট্যাঙ্কারট্র্যাকার ডটকমের তথ্য অনুসারে, ২০২৩ সাল থেকে ‘ভেরোনিকা-৩’ রাশিয়া, ইরান এবং ভেনেজুয়েলা তেল পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এই ত্রিপক্ষীয় সংযোগ আন্তর্জাতিক তেল বাজারে জটিলতা বাড়িয়ে তুলেছে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও স্যান্কশন নীতির প্রেক্ষাপটে।
একজন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন, “মার্কিন সরকার যখন তেলবাহী জাহাজ দখল করে, তা শুধু নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগের নয়, বরং ভেনেজুয়েলা সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর একটি কৌশল।” তিনি আরও যোগ করেন, এই পদক্ষেপটি ক্যারিবীয় ও ইন্ডিয়ান মহাসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি শক্তিশালী করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।
দখলটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক রুটের ওপর প্রভাব ফেলবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। ইন্ডিয়ান মহাসাগরে শিপিং লাইনগুলো এখন অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করবে, এবং আন্তর্জাতিক নৌচালনা সংস্থাগুলো সম্ভাব্য অতিরিক্ত পরিদর্শনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ভেনেজুয়েলা সরকার এই দখলকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন হিসেবে দোষারোপ করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে। তবে মার্কিন সরকার জোর দিয়ে বলছে, নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও তেল বাজারের স্বচ্ছতা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয়।
পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে এই বিষয়টি আলোচনার বিষয় হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন, যদি দখলকৃত জাহাজের মালিকানা ও লেনদেনের তথ্য স্পষ্ট হয়, তবে আন্তর্জাতিক নৌ আইন অনুযায়ী অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
এই ঘটনাটি তেলবাহী জাহাজের নিরাপত্তা, নিষেধাজ্ঞা কার্যকারিতা এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নীতি নিয়ে নতুন বিতর্কের সূচনা করেছে। ভবিষ্যতে কী ধরনের কূটনৈতিক সমঝোতা হবে, তা নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র, ভেনেজুয়েলা সরকার এবং সংশ্লিষ্ট তৃতীয় দেশের পারস্পরিক আলোচনার ফলাফলের ওপর।



