বিশ্বের মুসলিম সম্প্রদায় ২০২৬ রমজান মাসের সূচনা নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছে; চাঁদ দেখার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে কিছু দেশে ১৮ ফেব্রুয়ারি, অন্যদিকে কিছু দেশে ১৯ ফেব্রুয়ারি রোজা শুরু হবে। রমজানের প্রথম দিন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত রোজার সময় দেশভেদে ব্যাপক পার্থক্য দেখাবে, যা ভৌগোলিক অক্ষাংশ ও ঋতুর পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত। আন্তর্জাতিক ইসলামী সংস্থা (OIC) এই বছরের চাঁদ দেখার সূচি সমন্বয় করে সদস্য দেশগুলোকে একত্রে জানিয়েছে, যাতে ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোতে সামঞ্জস্য বজায় থাকে।
উত্তর গোলার্ধের কাছাকাছি অবস্থিত দেশগুলোতে শীতের শেষের দিকে রোজার সময় তুলনামূলকভাবে কম থাকে; উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশে প্রথম রোজা দিনে সাওরার শেষ সময় সকাল ৫:১৩ এ এবং ইফতার সময় সন্ধ্যা ৫:৫৬ এ নির্ধারিত, ফলে মোট রোজার সময় ১২ ঘণ্টা ৪৩ মিনিট। মাসের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে দিন বাড়ার ফলে শেষ রোজা দিনে সাওরার শেষ সময় সকাল ৪:৪৭ এবং ইফতার সন্ধ্যা ৬:১০, যা রোজার সময়কে ১৩ ঘণ্টা ২৩ মিনিটে বাড়িয়ে দেয়।
দিল্লি, ভারতের রাজধানীতে রোজার সময়ও অনুরূপ ধারা অনুসরণ করে; প্রথম দিন সাওরার শেষ সময় সকাল ৫:৩৭ এবং ইফতার সন্ধ্যা ৬:১৫, ফলে রোজার সময় ১২ ঘণ্টা ৩৮ মিনিট। শেষ দিনে সাওরার শেষ সময় সকাল ৫:০৭ এবং ইফতার সন্ধ্যা ৬:৩৩, ফলে রোজার সময় ১৩ ঘণ্টা ২৬ মিনিটে পৌঁছায়। উভয় দেশের রোজার সময়ের এই বৃদ্ধি স্থানীয় সময়সূচি ও কর্মস্থলের পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলবে।
উচ্চ অক্ষাংশের দেশগুলোতে রোজার সময়ের পার্থক্য আরও স্পষ্ট। উত্তর ও দক্ষিণ উভয় অক্ষাংশে শীত ও গ্রীষ্মের ঋতু পরিবর্তনের ফলে রোজার সময় ১৭ থেকে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। বিশেষ করে সৌদি আরব ও কাতার এই বছর রোজা পালন করবে প্রায় ১৪ ঘণ্টা দৈনিক, যা তাদের ভৌগোলিক অবস্থান ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই সময়সূচি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও হজযাত্রার পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আর্কটিক অঞ্চলের দেশগুলোতে সূর্য কখনও অস্ত যায় না; গ্রিনল্যান্ড ও আলাস্কার মতো স্থানে রোজা পালন করা মুসলমানদের জন্য প্রচলিত সময়সূচি প্রয়োগ করা কঠিন। ইসলামী পণ্ডিতরা মক্কা ও সৌদি আরবের সময়কে মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণের পরামর্শ দেন, যাতে রোজা পালন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়। এই ধরনের ধর্মীয় নির্দেশনা স্থানীয় সরকার ও সম্প্রদায়ের মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে তুলতে সহায়ক।
দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলোতে রোজার সময় প্রথম দিকে দীর্ঘ হয়; চিলি, নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকায় রোজা শুরুতে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ ঘণ্টা ধরে থাকে। তবে মাসের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে দিন কমে যায় এবং রোজার সময় ধীরে ধীরে হ্রাস পায়। এই পরিবর্তন স্থানীয় কর্মসংস্থান, স্কুলের সময়সূচি এবং সামাজিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলবে।
বিশ্বব্যাপী রোজার সময়ের বৈচিত্র্য আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। মুসলিম দেশগুলো রমজান সূচি সমন্বয়ের জন্য একে অপরের সঙ্গে তথ্য শেয়ার করে, যাতে হজযাত্রা, আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও পর্যটন শিল্পে কোনো ব্যাঘাত না ঘটে। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, এই সমন্বয় কেবল ধর্মীয় ঐক্যই নয়, বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায়ও অবদান রাখে।
একজন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক বলছেন, “উচ্চ অক্ষাংশের দেশগুলোতে রোজার সময়ের চরম পার্থক্য ধর্মীয় চর্চা ও আধুনিক জীবনের মধ্যে সমন্বয়কে চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে, তবে প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক যোগাযোগের উন্নতি এই সমস্যার সমাধানে সহায়তা করছে।” একই সঙ্গে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো রমজান সূচি নির্ধারণে ঐতিহ্যবাহী চাঁদ দেখার পদ্ধতি ও আধুনিক জ্যোতির্বিদ্যা প্রযুক্তি একত্রে ব্যবহার করছে।
এই বছর রমজান শেষের দিকে, ২০২৬ সালের মার্চের প্রথম সপ্তাহে শেষ হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। শেষ রোজা দিনের সময়সূচি দেশভেদে ভিন্ন হবে, তবে সকল মুসলিম দেশের জন্য একত্রে ইফতার ও ত্রয়ী (ইদ-উল-ফিতর) উদযাপন একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় মুহূর্ত। রমজান শেষের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ভ্রমণ পরিকল্পনা পুনরায় চালু হবে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।



