সৌদি আরবের আবহা শহরে রাত ৩টায় (বাংলাদেশ সময় রাত ১১টায়) একটি গাড়ি দুর্ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে রামগঞ্জ, লক্ষ্মীপুরের এক পরিবারের চারজন সদস্য এবং গাড়ি চালক মোট পাঁচজনের প্রাণ নেওয়া হয়েছে। মৃতদের মধ্যে ৪২ বছর বয়সী মিজানুর রহমান, তার ৩০ বছর বয়সী স্ত্রী মেহের আফরোজ সুমী, ১৩ বছর বয়সী কন্যা মোহনা এবং দেড় বছর বয়সী ছোট সন্তান সুবাহ অন্তর্ভুক্ত। গাড়ি চালক ছিলেন রামগঞ্জের ভোলাকোট ইউনিয়নের ৩০ বছর বয়সী হোসেন মোহাম্মদ জিলানী, যাকে স্থানীয় সূত্রে “বাবর” বলে ডাকা হয়।
দুর্ঘটনা ঘটার মুহূর্তে পরিবারটি ওমরাহ পালন শেষে আবহা শহরের কাছাকাছি গন্তব্যে ফিরে যাচ্ছিল। গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গিয়ে গড়িয়ে পড়ে, ফলে গাড়ি ভেতরের সকলের মৃত্যু হয়। একই সময়ে আরেক কন্যা, ১১ বছর বয়সী ফাইজা আক্তার, গুরুতর আঘাত পেয়ে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং চিকিৎসা চলছে।
মিজানুর রহমান দীর্ঘ সময় ধরে আবহা শহরে হোটেল ব্যবসা পরিচালনা করতেন। তিনি এবং তার পরিবার ৩ ফেব্রুয়ারি হজের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব গিয়েছিলেন, এবং ওমরাহ সম্পন্ন করার পর দেশে ফিরে আসার পথে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। পরিবার সদস্যদের শোকের পরিবেশে, মা খুকি বেগম শোকে ভেঙে পড়েছেন এবং বাবা শহিদ উল্যাহ অসুস্থতার কারণে শোকের সঙ্গে সংগ্রাম করছেন বলে জানা গেছে।
রামগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ ফিরোজ উদ্দীন চৌধুরী জানান, ঘটনাটি তাদের জানানো হয়েছে এবং মৃতদেহ দেশে আনার প্রয়োজনীয় অনুমোদন হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবে। এছাড়া, বাংলাদেশ দূতাবাসের কনসুলার বিভাগ ইতিমধ্যে পরিবারকে সহায়তা প্রদান করছে এবং মৃতদের পুনর্বাসনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করছে।
এই ধরনের দুর্ঘটনা আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ-সৌদি আরব দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে, দু’দেশের কনসুলার সহযোগিতা প্রায়ই শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন, “সৌদি আরবে কাজ করা বাংলাদেশি শ্রমিকদের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নতি এবং কনসুলার সেবার গুণগত মান বাড়ানো দু’দেশের পারস্পরিক স্বার্থের বিষয়।” এই মন্তব্যটি বর্তমান পরিস্থিতিতে কনসুলার সেবার দ্রুততা ও কার্যকারিতা সম্পর্কে আলোচনার সূচনা করেছে।
সৌদি আরবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদেশি শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তবে গাড়ি দুর্ঘটনা ও কাজের পরিবেশে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখনও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলি নিয়মিতভাবে শ্রমিকদের নিরাপত্তা মানদণ্ডের উন্নয়নের আহ্বান জানায়। এই ঘটনার পর, বাংলাদেশি শ্রমিক সমিতিগুলি কনসুলার সেবা ও নিরাপত্তা প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে তুলতে চাপ দিচ্ছে।
অধিকন্তু, একই ধরনের দুর্ঘটনা পূর্বে সৌদি আরবে ঘটেছে, যেখানে বাংলাদেশি শ্রমিকদের গোষ্ঠী একাধিকবার গাড়ি দুর্ঘটনা ও কাজের সময় আঘাতের শিকার হয়েছে। এই ঘটনাগুলি কনসুলার সেবার দ্রুততা, পরিবারকে সমর্থন এবং পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।
সৌদি আরবের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ দুর্ঘটনা তদন্তের জন্য একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে এবং গাড়ির টেকনিক্যাল অবস্থা, চালকের স্বাস্থ্য ও রোড সেফটি মানদণ্ড যাচাই করবে বলে জানিয়েছে। একই সঙ্গে, বাংলাদেশ সরকারও কনসুলার দায়িত্বের অংশ হিসেবে পরিবারকে মানসিক ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করার পরিকল্পনা করেছে।
এই দুঃখজনক ঘটনার পর, লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলায় শোকের পরিবেশ ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় মানুষ এবং ধর্মীয় নেতারা শোকের সমাবেশে একত্রিত হয়ে মৃতদের আত্মার শান্তি কামনা করেছেন। ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা রোধে গাড়ি চালকের প্রশিক্ষণ, রোড সেফটি সচেতনতা এবং কনসুলার সেবার দ্রুততা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা আবারও জোরালোভাবে প্রকাশ পেয়েছে।



