মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউডিয়া শেইনবাউম পার্ডো এবং মেক্সিকান-আমেরিকান অভিনেত্রী স্যালমা হায়েক পিনলফ এই সপ্তাহে মেক্সিকো সিটিতে একত্রিত হয়ে দেশের চলচ্চিত্র শিল্পকে সমর্থনকারী নতুন কর প্রণোদনা ঘোষণা করেন। প্রস্তাবিত ব্যবস্থা চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন উৎপাদনের জন্য ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কর ছাড় প্রদান করবে।
এই কর ছাড়ের হার আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে তুলনীয় এবং মেক্সিকোকে বিদেশি নির্মাতাদের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্যে রূপান্তরিত করার লক্ষ্য রাখে। এতে উৎপাদন খরচের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কমে যাবে, যা বড় বাজেটের প্রকল্পগুলোকে দেশীয় শ্যুটিংয়ে উৎসাহিত করবে।
প্রণোদনা লাইভ-অ্যাকশন এবং অ্যানিমেটেড ফিচার চলচ্চিত্রসহ টেলিভিশন সিরিজের এপিসোডের জন্য প্রযোজ্য, তবে এতে অংশগ্রহণের জন্য ন্যূনতম ৪০ মিলিয়ন পেসো (প্রায় ২.৩ মিলিয়ন ডলার) দেশের মধ্যে ব্যয় করতে হবে। এই শর্ত পূরণ করলে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে মোট ব্যয়ের ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কর রিফান্ড পাওয়া যাবে।
ডকুমেন্টারি ফিচার এবং সিরিজের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ব্যয় ২০ মিলিয়ন পেসো (প্রায় ১.২ মিলিয়ন ডলার) নির্ধারিত হয়েছে। এই সীমা অতিক্রম করলে একই রকম কর সুবিধা প্রদান করা হবে।
অ্যানিমেশন, ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস এবং পোস্ট-প্রোডাকশন কাজের জন্য ন্যূনতম ব্যয় ৫ মিলিয়ন পেসো (প্রায় ২৯০ হাজার ডলার) নির্ধারিত। এই বিভাগে কাজ করা স্টুডিও ও ফ্রিল্যান্সারদের জন্যও ৩০ শতাংশ কর ছাড়ের সুযোগ থাকবে।
প্রণোদনা মেক্সিকান ব্যক্তিগত ও আইনি সত্তা, পাশাপাশি মেক্সিকোতে স্থায়ী শাখা থাকা বিদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে। এছাড়া মেক্সিকান বাসিন্দা বা আইনি সত্তার মাধ্যমে উৎপাদন পরিচালনাকারী বিদেশি সত্তাগুলিকেও এই সুবিধা প্রদান করা হবে।
এই উদ্যোগটি যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনের বাড়তি চাপে গৃহস্থালি শ্যুটিং বাড়ানোর নীতি থেকে উদ্ভূত একটি প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা হচ্ছে। মেক্সিকো এখন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান নিতে চায়, যাতে বিদেশি প্রকল্পগুলো দেশের সীমানার বাইরে না থাকে।
প্রেসিডেন্ট পার্ডো উল্লেখ করেন, এই প্রোগ্রামের মূল উদ্দেশ্য হল দেশের সৃজনশীল শক্তিকে সমর্থন করা এবং মেক্সিকান জনগণের আত্মবিশ্বাস বাড়ানো। তিনি মেক্সিকানদের ইতিহাসে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং সাংস্কৃতিক অধিকার রক্ষার কথা তুলে ধরেন।
সেলমা হায়েক পিনলফও এই উদ্যোগকে দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের গর্ব বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, প্রকৃত ও অর্থবহ গল্প বলার মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়কে শক্তিশালী করা সম্ভব, এবং এখন মেক্সিকোর জন্য কোনো তুলনা নেই।
বিশেষজ্ঞরা আশা করেন, ৩০ শতাংশ কর ছাড়ের মাধ্যমে বড় বাজেটের হোলিভুড ও ইউরোপীয় প্রযোজকরা মেক্সিকোর স্টুডিও, লোকেশন ও কর্মশক্তি ব্যবহার করতে আগ্রহী হবে। এতে স্থানীয় কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নত হবে।
পূর্বে মেক্সিকোতে চলচ্চিত্র উৎপাদনের জন্য প্রযোজ্য কর সুবিধা সীমিত ছিল এবং প্রধানত ছোট বাজেটের স্বতন্ত্র প্রকল্পগুলোর জন্যই প্রযোজ্য হতো। নতুন ৩০ শতাংশের ছাড়ের হার এই সীমা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বড় বাজেটের প্রকল্পগুলোকেও আকর্ষণ করার উদ্দেশ্য বহন করে। সরকার এই পদক্ষেপকে শিল্পের কাঠামোগত উন্নয়ন ও বিশ্বমানের প্রতিযোগিতার জন্য প্রয়োজনীয় ধাপ হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
গত কয়েক বছর ধরে মেক্সিকান চলচ্চিত্র ‘রোমা’ এবং ‘বায়োনিকা’ মতো কাজগুলো আন্তর্জাতিক মঞ্চে স্বীকৃতি পেয়ে দেশীয় শিল্পের গর্ব বাড়িয়ে তুলেছে। এসব সাফল্য স্থানীয় ট্যালেন্টের উচ্চমান এবং সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। নতুন কর প্রণোদনা এই সাফল্যের ধারাকে অব্যাহত রাখার পাশাপাশি আরও বেশি বৈশ্বিক গল্পকে মেক্সিকোর দৃশ্যে রূপান্তরিত করতে সহায়তা করবে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা গেলে, প্রত্যাশা করা হচ্ছে যে কর ছাড়ের ফলে বিদেশি বিনিয়োগে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে এবং সরাসরি চলচ্চিত্র উৎপাদন সংক্রান্ত কর্মসংস্থান দশ হাজারেরও বেশি বাড়বে। এছাড়া, শ্যুটিং লোকেশন হিসেবে ব্যবহৃত স্থানগুলোতে পর্যটন ও হোটেল ব্যবসা ত্বরান্বিত হবে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে বহুমুখী সুবিধা আনবে। সরকার এই প্রোগ্রামকে দীর্ঘমেয়াদী শিল্প নীতি হিসেবে বিবেচনা করে, কর রাজস্বের সম্ভাব্য হ্রাসকে ভবিষ্যৎ আয়ের বৃদ্ধির মাধ্যমে পূরণ করার পরিকল্পনা করেছে।
স্থানীয় প্রযোজক ও স্টুডিওগুলো ইতিমধ্যে নতুন প্রণোদনা নিয়ে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়ে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে এবং উচ্চমানের কন্টেন্ট তৈরি করতে প্রস্তুত বলে প্রকাশ করেছে। কিছু বড় হোলিভুড স্টুডিও ইতিমধ্যে মেক্সিকোর লোকেশন স্কাউটিং শুরু করেছে এবং শ্যুটিং শিডিউলকে মেক্সিকোতে স্থানান্তরের সম্ভাবনা বিবেচনা করছে। শিল্পের এই উচ্ছ্বাস নতুন নীতি বাস্তবায়নের পর দ্রুত ফলাফল দেখার প্রত্যাশা বাড়িয়ে দিয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, নতুন কর প্রণোদনা মেক্সিকান চলচ্চিত্র শিল্পকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে আরও দৃঢ় অবস্থানে নিয়ে আসবে এবং দেশীয় সৃজনশীলতা ও অর্থনীতির উভয়ের জন্য দীর্ঘমেয়াদী সুবিধা প্রদান করবে। প্রয়োগের পর প্রথম বছরেই বিনিয়োগ ও উৎপাদনের পরিমাণে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি প্রত্যাশিত।



