মিউনিখের ব্যস্ত কেন্দ্রস্থলে ড্রোন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংক্রান্ত পোস্টারগুলো শহরের ঐতিহ্যবাহী শপিং গলিকে সামরিক প্রস্তুতির নতুন চিত্রে রূপান্তরিত করেছে। এই দৃশ্যটি ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্গঠনের সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে জার্মানির দক্ষিণের বাভারিয়া অঞ্চল রক্ষা প্রযুক্তির প্রধান কেন্দ্র হিসেবে উদ্ভাসিত।
মিউনিখের প্রধান পায়ে চলা বুলেভার্ডে এক পুরনো গির্জার স্ক্যাফোল্ডে ঝলমলে সাদা-কালো ফটোতে ‘ইউরোপের নিরাপত্তা নির্মাণে’ শ্লোগানটি বড় অক্ষরে টাঙানো হয়েছে। পোস্টারগুলোতে পরবর্তী প্রজন্মের ড্রোন, স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম এবং এয়ারস্পেস প্রযুক্তির ছবি দেখা যায়, যা শহরের ঐতিহ্যবাহী চিত্রকে বদলে নতুন নিরাপত্তা দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করে।
এই ধরনের প্রকাশ্য সামরিক চিত্রকল্প কয়েক বছর আগে মিউনিখে কল্পনাতীত ছিল; তবে রাশিয়া ও চীনের আক্রমণাত্মক নীতি, এবং যুক্তরাষ্ট্রের অনিশ্চিত নীতি পরিবর্তনের ফলে ইউরোপীয় দেশগুলো এখন নিরাপত্তা উদ্বেগে ভুগছে। ইউরোবারোমিটার সমীক্ষা অনুযায়ী, ৬৮ শতাংশ ইউরোপীয় নাগরিক তাদের দেশের নিরাপত্তা হুমকির মুখে রয়েছে বলে মনে করেন।
বাভারিয়ার রক্ষা প্রযুক্তি কেন্দ্রটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ড্রোন এবং মহাকাশ গবেষণায় বিশেষজ্ঞ, এবং এখানে বহু আন্তর্জাতিক কোম্পানি ও গবেষণা সংস্থা একত্রিত হয়েছে। এই অঞ্চলটি এখন জার্মানির সামরিক উদ্ভাবনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত, যা ইউরোপের সামগ্রিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
জার্মানির ফেডারেল সিভিল প্রোটেকশন ও দুর্যোগ সহায়তা সংস্থা শীতকালে প্রথমবারের মতো শীতল যুদ্ধের পর থেকে যুদ্ধের সম্ভাবনা ‘অনুমানযোগ্য নয়’ নয়, বরং ‘অনিবার্য’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। সংস্থাটি নাগরিকদের তিন থেকে দশ দিন পর্যন্ত খাবার সংরক্ষণ করার পরামর্শ দিয়েছে, যাতে অপ্রত্যাশিত সংকটে প্রস্তুত থাকা যায়।
ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামো এখন ঐতিহ্যবাহী ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন জোটের ওপর নির্ভরশীল, তবে কিছু বিশ্লেষক যুক্তি দিচ্ছেন যে অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মতো দেশগুলোর সঙ্গে নতুন, স্বল্পমেয়াদী জোট গঠন প্রয়োজন হতে পারে। এই আলোচনাটি ইউরোপের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ও বহুমুখী নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।
ন্যাটোর সেক্রেটারি জেনারেল মার্ক রুটে উল্লেখ করেছেন যে ২০২৯ সালের মধ্যে জার্মানির রক্ষা বাজেট ইউকে ও ফ্রান্সের সম্মিলিত বাজেটের চেয়ে বেশি হবে। তিনি এই ব্যয়ের পরিমাণকে ১৫০ বিলিয়ন ইউরো হিসেবে উল্লেখ করে ‘অত্যন্ত বিশাল’ বলে বর্ণনা করেছেন।
এই আর্থিক বৃদ্ধি ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোর দৃষ্টিতে জার্মানির প্রতিরক্ষা ক্ষমতা শক্তিশালী করার সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে, এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিবেচিত। যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ক্ষেত্রে শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখার পক্ষে ছিলেন, যদিও তার নীতি ও বর্তমান প্রশাসনের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
ইউরোপীয় দেশগুলো এখন প্রশ্নের মুখে যে ঐতিহ্যবাহী যুক্তরাষ্ট্র-ন্যাটো জোটই যথেষ্ট কিনা, নাকি নতুন কৌশলগত অংশীদারিত্বের দরকার। বাভারিয়ার প্রযুক্তি হাবের দ্রুত বিকাশ এবং জার্মানির রক্ষা ব্যয়ের বৃদ্ধি এই আলোচনার মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে ইউরোপের নিরাপত্তা নীতি এখন কেবল সামরিক ব্যয় নয়, বরং প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা এবং শিল্প সহযোগিতার সমন্বয়ে গঠিত হবে। এ ধরনের বহুমুখী পদ্ধতি রাশিয়া ও চীনের আক্রমণাত্মক নীতি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অবশেষে, ইউরোপের দেশগুলোকে দ্রুত পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক পরিবেশে নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠন করতে হবে, যাতে নিরাপত্তা হুমকি কমে এবং স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। জার্মানির রক্ষা বাজেটের বৃদ্ধি এবং বাভারিয়ার প্রযুক্তি কেন্দ্রের সম্প্রসারণ এই প্রক্রিয়ার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে।



