বিশ্বের আকাশে ২০২৬ সালের প্রথম বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ আগামীকাল, ১৭ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার, বাংলাদেশ সময় বিকেল পাঁচটা পঞ্চান্ন মিনিটে শুরু হবে। এই সময় চাঁদ সূর্যের মাঝখানে দিয়ে অন্ধকারের একটি রিং তৈরি করবে, যা পুরো সূর্যকে ঢাকতে পারবে না। বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিদদের মতে, এই ধরনের গ্রহণের দৃশ্য পৃথিবীর নির্দিষ্ট অংশে সরাসরি দেখা যায়।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গ্রহণের সূচনা সুনির্দিষ্টভাবে ১৭ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৫টা ৫৬ মিনিট ৩৬ সেকেন্ডে হবে এবং শেষ হবে রাত ৮টা ২৭ মিনিট ৩৬ সেকেন্ডে। এই সময়সীমা পুরো গ্রহের বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে, তবে বাংলাদেশে এই সময়ে সন্ধ্যা ও রাতের অন্ধকার থাকবে। ফলে দেশের অধিকাংশ অংশে সূর্যগ্রহণের দৃশ্য দেখা সম্ভব হবে না।
আইএসপিআর জানিয়েছে যে, বাংলাদেশের আকাশে এই মুহূর্তে সূর্য দৃশ্যমান না থাকায় স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা সরাসরি এই ঘটনার ছবি তুলতে পারবেন না। তবে আর্জেন্টিনা, চিলি, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের কিছু অঞ্চল থেকে এই বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণকে স্পষ্টভাবে পর্যবেক্ষণ করা যাবে। এই অঞ্চলগুলোতে গ্রহণের সময় সূর্যের কেন্দ্রের চারপাশে উজ্জ্বল রিং দেখা যাবে, যা আকাশে এক অনন্য দৃশ্য তৈরি করবে।
বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণের বৈশিষ্ট্য হল, যখন চাঁদ পৃথিবীর থেকে দূরে থাকে এবং তাই তার কৌণিক আকার ছোট হয়, তখন তা সূর্যের পুরো পৃষ্ঠকে ঢাকতে পারে না। ফলে সূর্যের আলো কেন্দ্রের চারপাশে একটি উজ্জ্বল বৃত্তের আকারে অবশিষ্ট থাকে, যা সাধারণত ‘বেল্ট’ বা ‘রিং’ নামে পরিচিত। এই রিংটি সূর্যের প্রান্তে আলোর একটি হালকা পরিধি তৈরি করে, যা রাতের অন্ধকারের মধ্যে উজ্জ্বলভাবে দেখা যায়।
গ্রহণের সময় পৃথিবীর যে অংশগুলো এই রিংটি দেখতে পাবে, তাকে ‘অ্যানুলার পাথ’ বলা হয়। এই পাথের মধ্যে থাকা দেশ ও অঞ্চলগুলোতে সূর্যের কেন্দ্রের চারপাশে একটি সরু আলোের বৃত্ত দেখা যাবে, আর পাথের বাইরে থাকা স্থানে আংশিক গ্রহণ বা সম্পূর্ণ অন্ধকার দেখা না-ও যেতে পারে। বর্তমান গ্রহণের অ্যানুলার পাথ আর্জেন্টিনা, চিলি, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং অ্যান্টার্কটিকার কিছু অংশকে অন্তর্ভুক্ত করে।
যারা এই গ্রহণকে সরাসরি দেখতে চান, তাদের জন্য নিরাপদ পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি। সরাসরি সূর্যের দিকে তাকানো চোখের ক্ষতি করতে পারে, তাই বিশেষ সূর্যগ্রহণ চশমা বা যথাযথ ফিল্টার ব্যবহার করা উচিত। চশমা না থাকলে কোনো সরাসরি পদ্ধতি ব্যবহার না করে, টেলিস্কোপ বা ক্যামেরার মাধ্যমে ফিল্টারযুক্ত লেন্স দিয়ে ছবি তোলা নিরাপদ বিকল্প।
বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই ধরনের গ্রহণের পর্যবেক্ষণ মহাকাশ গবেষণার জন্য মূল্যবান তথ্য সরবরাহ করে। চাঁদের কক্ষপথের সূক্ষ্ম পরিবর্তন, সূর্যের করোণা ও বায়ুমণ্ডলের প্রভাব ইত্যাদি বিশ্লেষণে এই রকম ঘটনার ডেটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিদ সংস্থা ও স্থানীয় গবেষণা দলগুলো এই গ্রহণের সময় বিশেষ যন্ত্রপাতি স্থাপন করে ডেটা সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে।
বাংলাদেশে যদিও সরাসরি দৃশ্যমান নয়, তবু অনলাইন স্ট্রিমিং ও রিয়েল-টাইম আপডেটের মাধ্যমে মানুষ এই মহাজাগতিক ঘটনার অংশ হতে পারে। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক সংস্থা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গ্রহণের লাইভ ভিডিও সম্প্রচার করবে, যাতে শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনগণ এই রোমাঞ্চকর দৃশ্যকে ঘরে বসে উপভোগ করতে পারে।
এই গ্রহণের আগে দেশের বিভিন্ন স্কুল ও কলেজে জ্যোতির্বিদ্যা বিষয়ক কর্মশালা ও সেমিনার আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। শিক্ষার্থীদেরকে সূর্যগ্রহণের বৈজ্ঞানিক পটভূমি, নিরাপদ পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি এবং এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কে জানানো হবে। এ ধরনের শিক্ষামূলক উদ্যোগ তরুণ প্রজন্মকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে আগ্রহী করে তুলতে সহায়তা করবে।
প্রাকৃতিক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত উদ্বেগ দূর করতে, বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন যে, এই গ্রহণের সময় কোনো প্রকার প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি প্রত্যাশা করা হয় না। শুধুমাত্র চোখের সুরক্ষার দিকে মনোযোগ দিলে নিরাপদে এই দৃশ্য উপভোগ করা সম্ভব।
সারসংক্ষেপে, ১৭ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবারের এই বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ বিজ্ঞানপ্রেমী ও সাধারণ মানুষ উভয়ের জন্যই একটি অনন্য সুযোগ। যদিও বাংলাদেশে সরাসরি দেখা যাবে না, তবু আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের মাধ্যমে রিয়েল-টাইম তথ্য ও ছবি পাওয়া সম্ভব।
আপনার যদি কোনো প্রশ্ন থাকে বা নিরাপদ পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি সম্পর্কে আরও জানার ইচ্ছা থাকে, তবে স্থানীয় জ্যোতির্বিদ্যা ক্লাব বা বৈজ্ঞানিক সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। এই মহাজাগতিক ঘটনার মাধ্যমে বিজ্ঞানকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া আমাদের যৌথ দায়িত্ব।



