সোমবার ভোরে লেবানন-সিরিয়া সীমান্তের কাছাকাছি একটি গাড়ি লক্ষ্য করে ইসরাইলি বোমা হামলা চালানো হয়, যার ফলে ঘটনাস্থলেই চারজনের মৃত্যু হয়। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, আঘাতপ্রাপ্তদের মধ্যে একজন সিরিয়ান নাগরিক, যার নাম খালেদ মোহাম্মদ আল-আহমাদ।
লেবাননের সরকারি সংবাদ সংস্থা ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সি উল্লেখ করেছে, চারজনের মধ্যে তিনজনের পরিচয় এখনও প্রকাশিত হয়নি, তবে মৃতদের মধ্যে অন্তত একজন সিরিয়ান নাগরিকের নাম নিশ্চিত করা হয়েছে। ইসরাইলি সশস্ত্র বাহিনীর বিবৃতি অনুসারে, এই অভিযানটি লেবাননে ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদের (পিআইজে) সদস্যদের লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়েছে, যদিও এ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।
আক্রমণটি লেবাননের মাজদাল আনজার এলাকায় ঘটেছে, যা লেবানন-সিরিয়া সীমান্তের নিকটবর্তী একটি কৌশলগত স্থান হিসেবে পরিচিত। পিআইজে এই ঘটনার সম্পর্কে তৎকালীন কোনো মন্তব্য প্রদান করেনি, ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে যে, লক্ষ্যবস্তু কি সত্যিই পিআইজের সদস্য ছিল নাকি অন্য কোনো গোষ্ঠী।
ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদ (পিআইজে) হল একটি সশস্ত্র সংগঠন, যা গাজা উপত্যকায় হামাসের সঙ্গে সমন্বয় করে স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে লড়াই করে। এই সংগঠনটি লেবাননের শিয়াতি গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মিত্রতা বজায় রাখে এবং উভয়ের সমন্বিত কৌশল প্রায়ই ইসরাইলের নিরাপত্তা নীতির মুখে আসে।
ইসরাইল ও হিজবুল্লাহ ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর করলেও, পরবর্তী সময়ে ইসরাইলের লেবাননে ধারাবাহিক আক্রমণ চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠে এসেছে। এই অভিযোগগুলো ইসরাইলের সীমান্তবর্তী নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং হিজবুল্লাহর সামরিক ক্ষমতার মধ্যে চলমান উত্তেজনার সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়।
আঞ্চলিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, ইসরাইলের এই ধরনের সীমান্তবর্তী হামলা তার নিরাপত্তা নীতি ও লেবাননের রাজনৈতিক গতিবিধির জটিলতা প্রকাশ করে। তারা যুক্তি দেন, ইসরাইলের লক্ষ্য হয় সম্ভাব্য হুমকি নির্মূল করা, তবে একই সঙ্গে লেবাননের অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়, যা দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা ক্ষুণ্ন করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এই সংঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গৃহীত যুদ্ধবিরতি চুক্তি সত্ত্বেও, ইসরাইলের ধারাবাহিক আক্রমণকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে সমালোচনা বাড়িয়ে তুলেছে। ইউএন নিরাপত্তা পরিষদে কিছু দেশ ইসরাইলের কার্যক্রমের পর্যালোচনা ও সীমাবদ্ধতা দাবি করে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
লেবাননের সরকারী সূত্র অনুযায়ী, হামলার পরপরই জরুরি সেবা দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করে, তবে গাড়ির ধ্বংসাবশেষে মৃতদেহের সংখ্যা নিশ্চিত করা হয়। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে, ভবিষ্যতে এমন ধরনের আক্রমণ রোধে সীমান্ত নিরাপত্তা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
অঞ্চলীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেন, যদি ইসরাইলের আক্রমণ ধারাবাহিকভাবে চালু থাকে, তবে লেবাননের শিয়াতি গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সঙ্গে পিআইজের সমন্বয় আরও শক্তিশালী হতে পারে, যা সামগ্রিক সংঘাতের মাত্রা বাড়াতে পারে। তারা আরও উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলো ইতিমধ্যে সীমান্তবর্তী এলাকায় বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এই ঘটনার পর, লেবাননের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইসরাইলের সঙ্গে সরাসরি সংলাপের আহ্বান জানিয়েছে, যাতে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বেসামরিক প্রাণহানি রোধ করা যায়। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের ডিপ্লোম্যাটিক চ্যানেলগুলোর মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য অতিরিক্ত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো এই হামলাকে লেবানন-সিরিয়া সীমান্তে চলমান উত্তেজনার একটি নতুন মাত্রা হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং ভবিষ্যতে সংঘাতের বিস্তার রোধে তৎপরতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে। পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে, এবং কোনো নতুন উন্নয়ন ঘটলে তা আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় দ্রুত প্রকাশ করা হবে।



