সাম্প্রতিক জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা জেলায় দুটি আসনে বিজয়ী হলেন বিএনপি প্রার্থী। দাকোপ‑বটিয়াঘাটা (খুলনা‑১) আসনে আমীর এজাজ খান এবং ডুমুরিয়া‑ফুলতলা (খুলনা‑৫) আসনে মোহাম্মদ আলি আসগার (লবি) ভোটের অধিকাংশ পেয়ে জয়লাভ করেন, যা ১৯৯৬ সালের একতরফা নির্বাচনের পর থেকে প্রথমবারের মতো দুটি আসনে একসঙ্গে জয় অর্জনকে নির্দেশ করে।
খুলনা‑১ আসন ঐতিহাসিকভাবে হিন্দু ভোটারদের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ২০২২ সালের জনগণনা অনুযায়ী দাকোপ উপজেলায় ৫৪.৪৪ শতাংশ এবং বটিয়াঘাটায় ২৭.৫৬ শতাংশ মানুষ হিন্দু। ১৯৯৬ সালের পর থেকে বিএনপি এই দুই আসনে কোনো জয় পায়নি; ২০০১, ২০০৮ ও ২০১৮ সালে প্রার্থী হারে গিয়েছিলেন। তবে ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে দলটি হিন্দু সম্প্রদায় ও আওয়ামী লীগ ভোটারদের লক্ষ্য করে বিশেষভাবে ক্যাম্পেইন চালায়।
এই প্রচারের অংশ হিসেবে বিএনপি প্রার্থী আমীর এজাজ খান পূর্বের তিনবারের পরাজয়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ভোটারদের কাছে নিজের স্থানীয় সংযোগ জোর দেন। একই সময়ে জামায়াত-এ-ইসলামি এই অঞ্চলে দীর্ঘদিনের দুর্বল অবস্থান বজায় রেখেছে এবং ১৯৯৬ সালের পর থেকে কোনো প্রার্থী দায়ের করেনি। তবে প্রথমবারের মতো তারা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কৃষ্ণ নন্দীকে প্রার্থী হিসেবে উপস্থাপন করে, যিনি হিন্দু ভোটারদের নিরাপত্তা ও চাঁদাবাজমুক্ত এলাকা গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রচার চালান, যদিও তিনি স্থানীয় নয় এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারেননি।
খুলনা‑১ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩,০৭,০০০। ফলাফল প্রকাশে দেখা যায় আমীর এজাজ খান ১,২১,৩৫২ ভোট পেয়ে জয়ী হন, আর তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কৃষ্ণ নন্দী ৭০,৩৪৬ ভোট সংগ্রহ করেন, ফলে ৫১,০০৬ ভোটের পার্থক্য তৈরি হয়। এই জয়কে তিনি তিন দশকের বেশি সময় ধরে এলাকার মানুষের পাশে থাকার ফলাফল হিসেবে উল্লেখ করেন এবং হিন্দু‑মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
খুলনা‑৫ আসনের ক্ষেত্রে ১৯৯৬ সালের পর থেকে বিএনপি কোনো প্রার্থী দায়ের করেনি; ২৯ বছর পর মোহাম্মদ আলি আসগার (লবি) প্রথমবারের মতো প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তিনি পূর্বে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের সভাপতি পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন এবং নির্বাচনী প্রচারে নিজের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও স্থানীয় সমস্যার সমাধানের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেন।
খুলনা‑৫ আসনে ভোটার সংখ্যা ও ভোটের বিশদ প্রকাশ না হলেও, ফলাফল নিশ্চিত করে যে মোহাম্মদ আলি আসগার জয়লাভ করে বিএনপির দীর্ঘ সময়ের শূন্যস্থান পূরণ করেন। এই জয়কে দলটি অঞ্চলে পুনরায় ভিত্তি গড়ার সূচক হিসেবে তুলে ধরেছে।
ইতিহাসের দৃষ্টিতে, প্রথম দুই জাতীয় সংসদে বর্তমান খুলনা‑১ আসনকে খুলনা‑৫ নামে পরিচিত করা হতো। প্রথম সংসদে আওয়ামী লীগের কুবের চন্দ্র বিশ্বাস এবং দ্বিতীয় সংসদে প্রফুল্ল কুমার শীল নির্বাচিত হন। এরশাদ শাসনামলে ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগও এই এলাকায় প্রভাব বজায় রেখেছিল।
বিএনপি এই দুই আসনে জয়লাভের মাধ্যমে দীর্ঘ সময়ের পর প্রথমবারের মতো খুলনা জেলায় পার্টির উপস্থিতি দৃঢ় করেছে। উভয় জয়ই হিন্দু ভোটারদের সমর্থনকে কেন্দ্র করে গঠিত ক্যাম্পেইনের ফলাফল, যা ভবিষ্যৎ নির্বাচনী কৌশলে প্রভাব ফেলতে পারে।



