দ্যুতি ফেব্রুয়ারি ১৬ রাত একটানা ফেসবুক পোস্টে আমজনতা দলের সদস্যসচিব মো. তারেক রহমান তার জীবনের পথচলা, কোটা ব্যবস্থা নিয়ে মতামত এবং সরকারের প্রতিক্রিয়া তুলে ধরেছেন। তিনি আইটি ব্যবসায়ী হিসেবে শুরু করে সরকারি চাকরির স্বপ্নে বহুবার ব্যর্থ হওয়ার পর কোটা সংস্কারের জন্য সক্রিয় হয়ে ওঠার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। পোস্টে তিনি উল্লেখ করেছেন, কোটা ব্যবস্থা কীভাবে বিভিন্ন গোষ্ঠীর জন্য সুবিধা ও বাধা তৈরি করেছে এবং তা কীভাবে পরিবর্তন করা উচিত।
তারেকের পরিবার তাকে ব্যবসা চালাতে উৎসাহিত করলেও, বাবা-মা সরকারি চাকরি করার ইচ্ছা প্রকাশ করতেন। ফলে তিনি আইটি সেক্টরে কাজ শুরু করেন, তবে সরকারি সেবায় কাজ করার আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করতে পারেননি। বহুবার ভিবিএ (ভিজিটর ব্যাকগ্রাউন্ড এক্সামিনেশন) দিয়ে চেষ্টা করার পরেও তিনি নির্বাচনী ও সিভিল সেবা পরীক্ষায় সফল হতে পারেননি। এই ব্যর্থতা তাকে কোটা ব্যবস্থার প্রতি প্রশ্ন তুলতে এবং সংস্কারের পথে এগিয়ে যেতে প্রেরণা দেয়।
কোটা ব্যবস্থার মূল সমস্যাগুলো তিনি স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন। শিক্ষক নিয়োগে ৮৪ শতাংশ কোটা, রেলওয়ে নিয়োগে ৪০ শতাংশ পারিবারিক বা পৌষ্য কোটা এবং প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে নির্দিষ্ট কোটা বরাদ্দের কথা তিনি উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, এই উচ্চ শতাংশের কোটা ব্যবস্থা যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে নিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে অনেক তরুণের স্বপ্নের চাকরি থেকে বঞ্চনা হয়।
তারেকের মতে, কোটা সংস্কারের জন্য তিনি ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগ নেয়া শুরু করেন। তিনি বলেন, কোটা ব্যবস্থা থেকে মুক্তি পেতে সমাজের বিভিন্ন স্তরে আন্দোলন চালিয়ে গেছেন। তবে সরকারী দৃষ্টিকোণ থেকে এই আন্দোলনকে কখনও কখনও মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে শত্রুতার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। শেখ হাসিনার সরকার এই আন্দোলনকে “রাজাকারদের আন্দোলন” বলে সমালোচনা করেছে।
বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, নারীরা, প্রতিবন্ধী এবং পাহাড়ি অঞ্চলগুলোর জন্য তিনি কিছুটা কোটা সংরক্ষণের প্রস্তাব দিয়েছেন। মোট ১৫ শতাংশ কোটা এই বিশেষ গোষ্ঠীর জন্য রাখা উচিত, এটাই তার ধারণা। তিনি যুক্তি দেন, এই গোষ্ঠীগুলোর জন্য নির্দিষ্ট কোটা না থাকলে সামাজিক সমতা অর্জন কঠিন হবে।
কোটা সংস্কারের লড়াইয়ে তিনি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন, তবে তিনি স্বীকার করেন যে পুরো কোটা ব্যবস্থা বাতিলের দিকে ধাবিত হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, শেখ হাসিনার জিদের ফলে কোটা সংস্কার প্রক্রিয়ায় বড় ক্ষতি হয়েছে। পুরো কোটা সিস্টেমের ফলাফল হিসেবে তিনি বলছেন, এটি সমাজের উন্নয়নে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
অবিকল, তারেকের মতে, অনগ্রসর জেলার জন্য জেলা ভিত্তিক বরাদ্দ ব্যবস্থা অপরিহার্য। কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, লালমনিরহাটের মতো এলাকায় তিনি বহুবার গিয়েছেন এবং দেখেছেন, সেখানে মানুষ দারিদ্র্যের সীমার নিচে বসবাস করে। এই এলাকার মানুষের জন্য বিশেষ বরাদ্দ নিশ্চিত করা উচিত, যাতে তারা সমান সুযোগ পায়।
তিনি আরও বলেন, অনগ্রসর জেলার জনসংখ্যার অনুপাত অনুযায়ী রিক্রুটমেন্টের অধিকার নিশ্চিত করা দরকার। কোটা ব্যবস্থা যদি বৈজ্ঞানিক ও আধুনিকভাবে পুনর্গঠন করা হয়, তবে সমাজের পিছিয়ে থাকা গোষ্ঠীর জন্য যথাযথ স্থান তৈরি হবে। তিনি বিশেষ করে গ্রাম ও গঞ্জের মেধাবী মেয়েদের জন্য অগ্রাধিকার নিশ্চিত করার কথা উল্লেখ করেছেন।
প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে নারী কোটা সম্পূর্ণ বাতিলের কোনো ইচ্ছা তিনি প্রকাশ করেননি। তবে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ৬০ শতাংশ নারী কোটা এবং ২০ শতাংশ পৌষ্য কোটা একসঙ্গে কীভাবে বজায় রাখা সম্ভব। এক খাতে ৬০ শতাংশ নারী কোটা থাকলে, অন্য খাতে তা শূন্যে নামিয়ে দেওয়া ন্যায়সঙ্গত হবে কিনা, তা তিনি সন্দেহজনক বলে উল্লেখ করেছেন।
কোটা সংস্কার আন্দোলনে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা না হওয়ায়, সরকারী দৃষ্টিকোণ থেকে সব কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তারেকের মতে, এই সিদ্ধান্ত আন্দোলনের মূল লক্ষ্যকে ক্ষুণ্ন করেছে এবং অধিকাংশ অংশগ্রহণকারীকে হতাশ করেছে। তিনি বলেন, রাগ ও ক্ষোভের মুহূর্তে সব কোটা একসঙ্গে বাতিল করা সঠিক পদক্ষেপ নয়।
কোটা সংস্কার নিয়ে কাজ করার সময় তিনি নিজের চাকরির সুযোগ হারিয়েছেন। তিনি স্বীকার করেন, সক্রিয়ভাবে আন্দোলনে যুক্ত থাকার ফলে সরকারি চাকরির দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এখন তিনি রাজনৈতিক কর্মে মনোনিবেশ করে, কোটা সংস্কারের জন্য জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন।
এই পোস্টের পরামর্শ ও বিশ্লেষণ দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। কোটা সংস্কার নিয়ে আলোচনা এখন সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে তীব্র বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারেকের মতামতকে সমর্থনকারী গোষ্ঠী এবং বিরোধী গোষ্ঠীর মধ্যে মতবিরোধ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
শেখ হাসিনার সরকার কোটা সংস্কারকে “রাজাকারদের আন্দোলন” বলে সমালোচনা করা সত্ত্বেও, এই বিষয়টি নির্বাচনী সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে উঠে এসেছে। কোটা সংস্কার নিয়ে ভোটারদের মতামত গঠন হতে পারে, যা পরবর্তী নির্বাচনে দলগুলোর কৌশল নির্ধারণে প্রভাব ফেলবে।
আমজনতা দল এই মুহূর্তে কোটা সংস্কারকে তাদের নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোর একটি মূল ধারা হিসেবে তুলে ধরছে। তারেকের বক্তব্যকে ভিত্তি করে দলটি অনগ্রসর জেলা ও বিশেষ গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ বরাদ্দের দাবি বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই দাবি পার্টির সমর্থকদের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পেয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, তারেকের ফেসবুক পোস্ট কোটা ব্যবস্থা, তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং সরকারের প্রতিক্রিয়া নিয়ে একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করেছে। তার মন্তব্যগুলো ভবিষ্যতে কোটা সংস্কার সংক্রান্ত নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই বিষয়কে দেশের সামাজিক ন্যায়বিচার ও সমতা অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখছেন।



